আজ সাংবাদিক মহসিন হোসাইনের মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী

কচুয়ার ডাকঃ
প্রয়াত মাকে নিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে বুধবার আবেগ ঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাংবাদিক মোঃ মহসিন হোসাইন। সে স্ট্যাটাসে অনেকেই লাইক ও কমেন্টস করেছেন। মহসিন হোসাইনের প্রয়াত মাকে নিয়ে স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীঃ

এ যেন ক্লান্তিময় এক দিনের সূচনা। মনের উদ্বেগকে কোনভাবেই মন থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না, বৃথা চেষ্টা মাত্র। চাপা কান্না আর শত কষ্টের ভারে বাতাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। স্পষ্টতই উপলব্ধি করছি এ মুহূর্তে মাকে হারানোর ব্যাথা আর শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই আমার ভাবনায় নেই।

১৫ মে আমার মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনটিতেই আমরা তিন ভাই এক বোন মাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। সেই থেকে এ দিনটি একান্তই আমাদের হয়ে গেছে বিশেষ দিন হিসাবে। মায়ের অকালে চলে যাওয়াতে ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সারাক্ষণই মনে হয় কী যেন নেই। অসীম এক স্তব্ধতা প্রতি মুহূর্তেই গ্রাস করে রাখে মন-প্রাণ। নিঃসীম নিরবতাই যেন আনন্দ। কাঁদতে চাইনা তারপরও বারবার ভারি ভারি অশ্রু বিন্দু এসে চোখ দুটোকে ঝাপসা করে ফেলে। গতকাল থেকেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না। দৈনন্দিন কাজকর্মেও ছন্দপতন ঘটছে মনের অজান্তেই। কিন্তু তবুও জীবন থেমে নেই বিরামহীন ছোটা।

প্রত্যাশা পূরণের আশা, স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের কাজটিতে মনোযোগ দেয়া, কিংবা স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া এসব আর আগের মত হয়ে উঠে না। কাছের প্রিয় মানুষগুলো যখন সবাইকে ছেড়ে চিরতরে অনন্তলোকে যাত্রা করেন তখন জীবনের প্রাণ চাতুর্য সব সময় মানুষকে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত রাখতে পারে না। সব আনন্দই উপভোগ করা সম্ভব হয় না। অজানা এক শূণ্যতা সারাক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে নিজেকে। আমরাও সেই পরিস্থিতির শিকার।

সন্তানের জীবনে মায়ের আসন হৃদয়ের সবটা জুড়েই। কেউবা তা প্রকাশ করতে পারেন খুব সহজে। আবার কোন কোন সন্তান তার প্রতিটি হৃদয় স্পন্দনে গভীর ভাবে তা উপলব্ধি করেন, কিন্তু প্রকাশ ক্ষমতায় তেমন পারদর্শী নন। আসলে বিশাল এক ছায়ার নাম ‘মা’। সন্তানের জীবনে মায়ের কোন বিকল্প নেই। মায়া, মমতা, আদর, স্নেহের এক অফুরন্ত ভান্ডার। জাগতিক জীবনে এক নিঃস্বার্থ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন তারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান, পৃথিবীতে চিরসুখী মানুষ। আমরা সেই সৌভাগ্য বঞ্চিতদের দলে। আজ যখন মাকে কাছে পেতে চাই, সময় দিতে চাই, মায়ের কষ্টের কিছুটা অংশীদার হতে চাই, নিজের সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে সেবা-যত্ন করতে চাই, সর্বোপরি মাকে সুখী করতে চাই কিন্তু তা আর হল না। যেদিকে তাকাই সর্বত্রই কেবল কষ্টের হাতছানি।

তুমি সর্বদা আমাদের সাথে থাকো, হয়তবা আমরা তোমাকে ডাকতেও পারিনা, ছুঁতেও পারিনা; কিন্তু এ দিনটির কথা মনে আসলে আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ি। আমাদের সব আনন্দ-বেদনার সঙ্গী ছিলে তুমি। জীবনের প্রতিটি বাঁকে মায়ের উপস্থিতি খুবই জরুরি। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! তোমার স্মৃতি আর অস্তিত্বকে উপলব্ধি করেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। অথচ এক সময় নিজের ভালোলাগাকে তুচ্ছ করে পরম যত্নে তুলে রাখতে আমাদের জন্য। আজ প্রার্থনা স্রষ্টার কাছে, তোমাকে যেন তিনি শান্তিতে রাখে। তোমার সকল পরিশ্রম, উৎকণ্ঠা, দুঃখ-কষ্ট, ভালোলাগা-মন্দলাগা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করছি বৈকি। আসলে তুমি ছিলে জীবনে মহামূল্যবান সম্পদ, মণিরত্নরাজি।

তুমি আমাদের মাঝে নেই ভাবতেই খুব কষ্ট লাগে। প্রতিদানের মানসিকতা নিয়ে মায়েরা সন্তান বড় করেন না। তবুও বারবার মনে পড়ছে তোমাকে কি তোমার যোগ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি? সে অপরাধ বোধ আর অপারগতার জন্য ক্ষমা চাওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে আর কীই বা করার আছে? পারলে আমাদের ক্ষমা করো।

সাফল্যে আর তোমার উচ্ছ্বাসময় হাসি চোখে পড়ে না। নানা প্রতিকূলতায় আশার বাণী শোনাও না। তুমি বড্ড সরল মনের মানুষ ছিলে। আবেগের আকূলতায় তোমার মুখটি ভেসে ওঠে স্মৃতির মণিকোঠায়। কারণে-অকারণে কত না কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। নিঃস্ব-নিঃসঙ্গ তোমাকে কখনোই শান্তি দিতে পারিনি, হয়তবা জীবনভর শুধু উৎকণ্ঠা আর সীমাহীন দুশ্চিন্তায় কেটেছে তোমার অনেকটা সময়। বলতে দ্বিধা নেই, তুমি ছিলে সৃজনশীল শৈল্পিক মনের একজন সরল-সাধারণ মানুষ। সেজন্য সন্তান হিসেবে আমরা গর্বিত। জীবন আর জগৎ সম্পর্কে ছিল তোমার গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। কী পেয়েছো আর কতটা পেতে পারতে তার হিসাব করে লাভ নেই। দূর থেকে দোয়া করো, যেন সব অশুভ অকল্যাণ আমাদের স্পর্শ না করে। পারিবারিক বন্ধন যেন আরও সুদৃঢ় হয়। প্রত্যেকে যেন প্রত্যেকের ওপর নির্ভর করতে পারি, যা তুমি সারাজীবন চেয়েছিলে। আজ নির্মলা মিশ্রের গানটির আকুতির সাথে মায়ের মমতা মেশানো আবেগ মিলেমিশে একাকার। তুমি ভাল থেকো অপারে, খুব ভাল থেকো মাগো।