এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা-ড. সেলিম জাহান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গভীর রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। সম্ভবত ওই রাতে পাকিস্তানি সেনাদের ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর পরই তাদের দ্বারা গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই তিনি এটা করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি নানানভাবে নানান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়েছিলো বাংলাদেশের জনগণ এবং বহিঃর্বিশ্বের কাছে সম্প্রচারের জন্যে। এ কারণেই পরবর্তী সময়ে হাতে লেখা এ ঘোষণাপত্রের যে প্রতিলিপি পাওয়া যায়, সেখানে প্রাপক হিসেবে নানান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখা যায়।

নানান প্রাপকের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠানোর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যে ২৫ মার্চের রাতে যখন সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, তখন এক ব্যক্তির কাছে তা পাঠালে সেটা তাঁর কাছে নাও পৌঁছুতে পারে। কিন্তু একাধিক মানুষের কাছে পাঠালে তা কারো না কারো কাছে পৌঁছুবেই এবং প্রচারিত হবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি মূল কথা নয়। মূল কথা হচ্ছে ২৫ মার্চ গভীর রাতে জাতির জনক শেখ মুজিবুর কহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘোষণাপত্রটি প্রাপকের কাছে পৌঁছে প্রচারিত হয়েছিল, সেটা বড় কথা নয়, ঘোষণাটি বড় কথা। আমি নিজে মনে করি, আসলে বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ করেছিলেন এই বলে যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, তখনই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন।

আরেকটি কথা। ঘোষণা দেওয়া আর ঘোষণাপত্র পাঠ করা কি এক কথা? মনে হয় না। রেডিও পাকিস্তানের ইংরেজি সংবাদ পাঠক প্রয়াত রিজওয়ান ওয়াস্তি একবার বলেছিলেন যে, গভীর রাতে রেডিও পাকিস্তানের গাড়ি যদি হঠাৎ করে তাঁকে বাড়ি থেকে বেতারকেন্দ্রে তুলে নিতে আসতো, তখনই তিনি জানতেন যে, পাকিস্তানে আরেকটি সামরিক অভুত্থান ঘটে গেছে। বেতার কেন্দ্রে গিয়ে রিজওয়ান ওয়াস্তি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া সামরিক শাসন জারির ঘোষণাপত্রটি পড়ে দিতেন, কিন্তু তার ফলে কখনোই এটা বলা যাবে না যে রিজওয়ান ওয়াস্তি পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছেন। না, বহুবার ওই ঘোষণাপত্র পাঠ করার পরেও তাঁকে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের ঘোষণাকারী বলা যাবে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হবে না। ধরা যাক, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে বেলাল মোহাম্মদ বেতারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করলেন। তাঁকে কি তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলা যাবে? না, বলা যাবে না। তিনি চিহ্নিত হবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক হিসেবে। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের কোনো পাঠককে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাকারী বলা যাবে না, কখনোই না, কস্মিনকালেও নয়। সে মর্যাদা শুধু একজনেরইÑ বঙ্গবন্ধুর। শুধুই তাঁর, শুধুই জাতির জনকের।

ড. সেলিম জাহান