কচুয়া উপজেলায় স্মৃতির আলপনায় তারেক রহমান -ড. আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন!

কচুয়া উপজেলায় স্মৃতির আলপনায় তারেক রহমান -ড. আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন!

দেশনায়ক তারেক রহমান সাধারন কোনো ব্যক্তি বিশেষ নন, তিনি জন্মগতভাবেই বিশ্বের অনন্য ব্যক্তিত্ব। বিশ্বে আর একজন সৌভাগ্যবান তারেক রহমান এর নজির নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়। তার বাবা স্বাধীনতার মহান ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। মা বেগম খালেদা জিয়া মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান এবং তিন বারের সফল প্রধানমন্ত্রী। গণতন্ত্র রক্ষায়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়, সকল অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপোষহীন যুদ্ধ করে লৌহমানবী হিসেবে স্বীকৃত। গণমানুষের ভালবাসায়, শ্রদ্ধায়, নিজ কর্মের সফলতায়, আগামীর বাংলাদেশ এবং গণতন্ত্র ,মানবাধিকার ,স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, অধীকারহীন এই জাতিকে এগিয়ে নিতে বাংলার আকাশের উজ্জল নক্ষত্র আগামীর দেশনায়ক জনাব তারেক রহমান ।
তখন অামি নীলফামারী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। বেলা প্রায় ১টা, সৈয়দপুর বিমানবন্দর হয়ে ঢাকায় রওনা দিব। বিমানের জন্য অপেক্ষা করছি। ফোন এলো, অপর প্রান্তে ‘ভাইয়ার’ কণ্ঠস্বর। জানতে চাইলেন কোথায়? উত্তর জেনে বললেন, গাড়িতে উঠুন, বগুড়া হয়ে ঢাকা যাবেন। ঢাকায় আমার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি জানানোর কোনো সুযোগ রইল না। সরাসরি গেলাম বগুড়া সরকারি মুজিবর রহমান মহিলা কলেজে। অভ্যর্থনার জন্য কলেজ প্রাঙ্গণে হরেক রকম ফুলের সাজে সজ্জিত সুন্দর একটি গেটের সামনে ফুল আর মালা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রিন্সিপাল, শিক্ষয়িত্রী ও বাসন্তী রংয়ের শাড়ি পরে, চুলের গোছায় বেলি ফুলের মালা গুঁজে, সাজ সাজ রবে একঝাঁক শিক্ষার্থী। গাড়ি গেটের সামনে থামল। পা বাড়াতেই ফুলের পাপড়ি ছিটাতে থাকল মহিলা কলেজের ছাত্রীরা। প্রিন্সিপাল ও কলেজের ভিপি এগিয়ে এলেন ফুলের তোড়া নিয়ে। প্রতিমন্ত্রীর পূর্ব নির্ধারিত প্রোগ্রাম না হওয়ায় বসন্তের বিকালে সাজের বন্যা দেখে জিজ্ঞাসু মন নিয়ে ফুলের তোড়া হাতে নিতেই সাজানো গেটের সাঁটানো ব্যানারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রধান অতিথি লেখা আছে- তারেক রহমান। ফুলের তোড়াটি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে চাইলাম, আমার প্রিয় নেতার আগমনের জন্য। কলেজের ভিপি আমাকে বললেন, অপরিহার্য কারণে আজ ‘ভাইয়া’ এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। আমরা দুঃখিত, সময় স্বল্পতার জন্য আপনার নামে ব্যানার করতে পারিনি। ভিতরে গিয়ে প্রথমেই ছাত্রীনিবাস, পরে কমনরুম ও লাইব্রেরির ফলক উন্মোচন করলাম। পরে মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। মঞ্চে বসে ছাত্রীদের বক্তব্য শুনছি আর মনে মনে ভাবছি, তারেক রহমান সত্যিই শুধু বিচক্ষণই নন, তিনি সব কাজে নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। কারণ যে ফলক আমি উন্মোচন করেছিলাম, সেখানে অতিউৎসাহী শিক্ষক ও ছাত্রীরা ফলকে উন্মোচনকারী হিসেবে তারেক রহমানের নাম লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি কোন প্রটোকলে ফলক উন্মোচন করবেন! তাই তিনি সেখানে যাননি, আমাকে পাঠিয়েছিলেন এবং টেলিফোনে প্রিন্সিপালকে বলেছিলেন, পরে ফলকে যেন আমার নাম লেখা হয়। ছাত্রীদের মনের ইচ্ছা ছিল যার অবদানে তারা ভবন পেয়েছিল, তার স্মৃতিফলক থাকা। সন্ধ্যায় বগুড়া শহরে ছয় এমপির উপস্থিতিতে তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জিয়া ফাউন্ডেশনের একটি সভায় আমাকে উপস্থিত হতে হবে প্রধান অতিথি হিসেবে। সুসজ্জিত সভাস্থলে একের পর এক বক্তা বক্তৃতা করছিলেন। মাননীয় এক সংসদ সদস্য, প্রধান অতিথির (আমার) বক্তব্যের মাঝামাঝি সময়ে সভাস্থলে এলেন। বক্তব্য শেষে ভেবেছিলাম, দেরিতে আসা সংসদ সদস্যকে বক্তব্যদানের সুযোগ হয়তো দেওয়া হবে, কিন্তু তা হয়নি। পরে শুনেছিলাম, সেই সংসদ সদস্য বেশ ব্যথিত হয়েছিলেন বক্তব্য দিতে না পারায়। কিন্তু তারেক রহমান সভার নিয়মশৃঙ্খলার কোনো ব্যত্যয় ঘটাননি। এখানেই শেষ নয়, আমরা অতিথিরা তারেক রহমানসহ সবাই টেবিলে খাওয়ার অপেক্ষায় বসে আছি। ক্ষুধার্ত থাকার কারণে আহার্যের গন্ধে পেটের চাহিদা খানিকটা বেড়ে গেলেও খাবার আমাদের টেবিলে না এসে চলে যাচ্ছিল অতিথিদের সঙ্গে আসা গানম্যান, গাড়ির ড্রাইভারদের টেবিলে। জানতে পারলাম, তিনি সব সময় অতিথিদের সঙ্গে আসা সদস্যদের খাওয়ানোর পরে গণ্যমান্য অতিথিদের খাবার পরিবেশন করতেন। এর পর থেকে আমিও একই পদ্ধতি অনুসরণ করছি।
রাজধানীর এলজিইডি অডিটোরিয়ামে জনাব তারেক রহমান এদেশের প্রতিটি গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করলে উচ্চ শিক্ষার জন্য জিয়া ফাউন্ডেশন থেকে আর্থিক অনুদান বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি ফান্ড রেইজিংয়ের জন্য উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দিকে আন্তরিকতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য আবেগাত্মক ছোট্ট একটি ভিডিও ক্লিপ তৈরি করেছিলাম। মনে পড়ে, নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে একটি ছোট্ট স্লোগান ছিল ‘Each One, Teach One’. এই পদ্ধতিতে প্রতিটি এসএসসি পরীক্ষার্থী একজন করে নিরক্ষর ব্যক্তিকে অক্ষর শিক্ষা দিতে পারলে ঐচ্ছিক নম্বর পাবে। সেটা স্মরণ রেখে আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, শহীদ জিয়ার ওই স্লোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘Each one, sponsor one’ ধারণা তুলে ধরা। মিলনায়তনে উপস্থিত প্রায় হাজার দুয়েক গণ্যমান্য বিশিষ্টজনের প্রতিজন যদি একজন অসহায় শিক্ষার্থীর দিকে তার উদার হাত সম্প্রসারিত করেন, তবেই হবে। ভিডিও ক্লিপটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ছিল। প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়, এক মহিলা বাসায় কাজ করে তার পিতৃহীন মেয়েটিকে লেখাপড়া করান, মেয়েটি এ প্লাস পেয়েছে। মঞ্চে উপবিষ্ট তারেক রহমানের সঙ্গে বসে আমি ভিডিও ক্লিপটি দেখছিলাম। প্রথম দৃশ্য দেখেই তিনি আমাকে বললেন, মিস্টার ক্লিনটন বন্ধ করুন! (তারেক ভাই আমাকে মি. ক্লিনটন বলে ডাকতেন)। ততক্ষণে শ্রোতা-দর্শকমণ্ডলীর চোখের কোণে জল। ভিডিওটি বন্ধ করার পরপরই তিনি আমাকে বললেন, উপস্থিত সবার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত টাচই বটে কিন্তু আপনি কি মেয়েটি ও তার মা’র কথা ভেবেছেন, মেয়েটির জন্য এটা কতটা লজ্জাজনক। আমি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার নিজেকে একজন নিদারুণ বোকা বলে মনে হতে লাগল। তারেক ভাইয়ের কথাটি খুবই সত্য। তাৎপর্যময়। আমি দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে উপস্থিত সুধীজনের সামনে পরবর্তী ভিডিও ক্লিপ না দেখানোর কারণ ব্যাখ্যা করে মেয়েটি ও তার মা’র কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। অনুষ্ঠানটি চলছিল স্বাভাবিক গতিতে।
এবার তারেক রহমানের প্রিয় বিষয় কৃষি বিপ্লব নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী। তিনি সারা দেশ ঘুরে বীজ, সার, কীটনাশকসহ কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের কর্মসূচি হাতে নেন। বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকায় কলাগাছের ভেলায় বা কচুরিপানার উপর বাঁশের চাটি বিছিয়ে সামান্য কাদা মাটি দিয়ে কীভাবে বীজতলা তৈরি করা যায়, বন্যার পানিতে কীভাবে অল্প সময়ে উচ্চবর্ধনশীল মাছ চাষ করা যায় ইত্যাদি প্রদর্শন করা হলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ, তাই বন্যার পানিকে অভিশাপ না ভেবে গবেষণার মাধ্যমে দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বীজ, ধান ও নানাবিধ হাইব্রিড ফসল উৎপাদন করা অর্থাৎ ‘Living with the Flood’ এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। প্রাচ্যের উন্নত দেশগুলোর মতো এদেশে আলু ও ভুট্টার বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ও চাষের অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করার ওপর জোর দেন তিনি। তাছাড়া বন্যার পর আলু, ভুট্টা, কাউন ও তিল চাষ করে একই জমিতে বহুবিধ ফলনের উপযোগীকরণ, সবজি চাষে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ব্যবস্থা ও কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার ওপর প্রতিবেদন দেখালেন। এর পর জিয়া ফাউন্ডেশন থেকে স্বাস্থ্যসেবায় এদেশের চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও জিয়া ফাউন্ডেশন থেকে হাসপাতাল নির্মাণ ও ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার তৈরি করার কাজের ওপর শেষ প্রতিবেদনটি দেখালেন।
২০০৪ সাল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি তারেক রহমান তৃণমূলে সংগঠন গোছানোর জন্য বাংলাদেশের জনগণকে, এদেশের মাটি-প্রকৃতিকে ভালোবেসে, এই ভৌগোলিক সীমারেখার ভিতরে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি উপজাতি সবাইকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার জন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম হয়ে চাঁদপুর সফর শেষে দাউদকান্দি হয়ে ঢাকা ফিরবেন।  চাঁদপুরের উত্তর মতলব থেকে যাত্রা শুরু করে চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ, শাহরাস্তি হয়ে কচুয়ার আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ফিরবেন ঢাকায়। ধারণা ছিল, চাঁদপুর সফর শেষ করে কচুয়ায় ঢুকতে ঢুকতে হয়তোবা বিকাল গড়িয়ে যাবে।
সে রকম প্রস্তুতি নিয়েই আমরা কচুয়ার স্পটগুলোতে জনসভার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নেত্রী, রোকেয়া হলের সাবেক সভানেত্রী, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক, কচুয়ার মেয়ে, আমার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীকে কচুয়ার উত্তর অংশের দায়িত্ব দিলাম আর আমি দক্ষিণ অংশের দায়িত্ব নিলাম। পাঠকের অবগতির জন্য বলছি, কচুয়া উপজেলাটি প্রায় ৪৪ কিলোমিটার লম্বা এবং এর পার্শ্ববর্তী পরিবেষ্টিত উপজেলাগুলো হলো- মতলব উত্তর, দাউদকান্দি, চান্দিনা, বরুড়া, লাকসাম, শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ ও মতলব দক্ষিণ। দক্ষিণ আমেরিকার চিলির মতো বাংলাদেশের ম্যাপে কচুয়ার অবস্থান। এ দীর্ঘ পথ কচুয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানকে পাড়ি দিতে হবে, তাই জনতার আবেগের কথা চিন্তা করে কচুয়া দক্ষিণ প্রান্তে জগৎপুরে একটি ভেন্যু, এরপর রহিমানগর স্কুল ও কলেজ মাঠে দ্বিতীয় ভেন্যু, তৃতীয়টি হলো কচুয়া ডিগ্রি কলেজের মাঠে, চতুর্থটি হলো সর্ব উত্তরে সাচার হাইস্কুল ও কলেজ মাঠে। শুনেছিলাম, অনেক বয়োজ্যেষ্ঠই বলে থাকেন, শহীদ জিয়া এ কচুয়ার আঁকাবাঁকা মেঠো পথে সেনাবাহিনীর জিপ দিয়ে সরকারি হালটের ওপর দিয়ে সাচার হয়ে দাউদকান্দি দিয়ে ঢাকা ফিরেছিলেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর জিপের চাকার চিহ্ন অনুসরণ করেই রাস্তা তৈরি হয়েছিল বিধায় কচুয়ার রাস্তায় অনেক আঁকাবাঁকা। কচুয়ার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি রাস্তায় থেমে থেমে জনগণের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের কুশলাদি জেনেছিলেন।
এ ছাড়া তিনি হাজীগঞ্জ থেকে কচুয়ার বোয়ালজুড়ি ও সুন্দরী খাল নিজ হাতে খনন করেন। সেই সময় তিনি কচুয়ার চৌমুনি বাজারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। সেই কমলের (প্রেসিডেন্ট জিয়া) কোমল হাতের স্পর্শে কচুয়ায় জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের।
বেশ কয়েক দিন ধরেই কচুয়ার ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, পেশাজীবী দল, মহিলা দল ও মূল দলসহ সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, কখন আসবেন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা শহীদ জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান আগামী দিনের জাতীয়তাবাদের কাণ্ডারি তারেক রহমান। সারা কচুয়ায় এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো, চারদিকে যেন ঈদের সাজের মতো উচ্ছলতা, নেতা-কর্মীদের চোখে-মুখে আনন্দের বন্যা।
দেখতে দেখতে সেই আনন্দঘন মুহূর্তটি আমাদের দ্বারপ্রান্তে। সারা রাত পুরো কচুয়া নতুন সাজে দেখতে দেখতেই প্রায় ভোর আসন্ন। ভেবেছিলাম, দুপুর গড়িয়ে যাবে, উনি আসতে আসতে। এরই মধ্যে শুনতে পেলাম, ফজরের নামাজ পড়েই তিনি উত্তর মতলবে গণসংযোগে বেরিয়ে গেছেন। মনে পড়ে, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা নামাজ আদায়ের অভ্যাস করেছিলেন। যখনই বাবা-মার পরিধির বাইরে থাকতাম তখনই অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটত। মহল্লার সাথীদের নিয়ে তারাবির নামাজ পড়া অনেকটা আনন্দ ও উৎসবের বিষয় ছিল। তারাবির নামাজ পড়ে বেরিয়ে মসজিদের পাশে মুরব্বিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চা পান আর বন্ধুদের মধ্যে কেউবা ধূমপানের সুযোগ নিয়ে নিত। খতমে তারাবির নামাজ পড়ার অভ্যাস আমার কখনো ছিল না, যখন চিন্তা করতাম খতম তারাবি পড়ব তখন মনে ভয় হতো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সূরা শোনার ভীতি হতো মনে। তাই কখনো হয়ে উঠেনি খতম তারাবির নামাজ পড়া। হাওয়া ভবনে তারেক রহমান আয়োজন করলেন খতম তারাবির। সহিহ্ কায়দায় দ্রুত কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে এমন দুজন কোরআনে হাফেজকে দায়িত্ব দিলেন নামাজ পড়ানোর। আমি উৎসাহিত হলাম এবং যোগদান করলাম খতমে তারাবিতে। তিনি নামাজের পরপর প্রতিদিন আমাদের জন্য সুন্দর মুখরোচক বৈচিত্র্যময় দেশীয় স্বাদের খাবারের আয়োজন করতেন। কখন জানি না হয়তো তারেক ভাইয়ের উছিলায় খতমে তারাবি পড়ার বাসনা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। মনে আছে, রোজা ও দুর্গাপূজা যখন একই সময়ে শুরু হলো, তখন আমি দিনে কচুয়ায় পূজার অনুষ্ঠান শেষ করে তড়িঘড়ি করে গাড়িতে বসে ইফতার করতে করতে হাওয়া ভবনে হাজির হতাম তারেক ভাইয়ার সঙ্গে খতম তারাবির নামাজ আদায় করতে। আজও সে অভ্যাস রয়েছে আমার। শুধু আওয়ামী সরকারের সময়ে ৪৪৯ দিন যখন আমি বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ ছিলাম, তখন কারাগারে আমার সেলে তারাবি পড়তাম, তবে খতমে তারাবি নয়। ওই সময় খুব মনে পড়ত তারেক ভাইকে, ভাবতাম কবে আবার তারেক ভাইয়ের সঙ্গে নামাজ আদায় করব…!
দেখতে না দেখতেই বেলা ১১টার ভিতরে তারেক ভাইয়ের কচুয়া আগমন। আগাম সংবর্ধনা দেওয়ার সর্বাগ্রে কচুয়ায় ঢুকতে না ঢুকতে আমি সালাম দিতেই তিনি বললেন, ওই প্লাকার্ড, ফেস্টুন আর বড় বড় ছবি ছাপানোর জন্য যে পয়সা আপনি খরচ করেছেন, তা দিয়ে আপনি কচুয়ার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারতেন। প্রতি উত্তরে আমি একটু বিমোহিত চেহারা নিয়ে লজ্জামিশ্রিত হাসি দিয়ে নিজেকে এলাকার নেতাদের সামনে কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বললাম, আপনার জিয়া ফাউন্ডেশন থেকে তো এ কাজটি করছেনই। তাৎক্ষণিকভাবে তারেক ভাই বলে বসলেন, তাহলে আপনি ওই টাকাগুলো দিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ করতে পারতেন? আবারও বললাম, এবার কিন্তু আপনি কম্বলসহ অনেক শীতবস্ত্র পাঠিয়েছেন।
সামনের সিটে বসে আছি। আর তারেক ভাই গাড়ি ড্রাইভ করছেন। রাস্তার দুই পাশে হাজারও জনতা তারেক ভাইকে একনজর দেখার জন্য ভিড় করছেন। সামনে নিরাপত্তা কর্মীদের আগে পাঠিয়ে দিয়ে বললাম, সবাইকে রাস্তার ডান পাশে আসতে। তিনি গাড়ি ড্রাইভ করছেন আর তার কোমল হাত দিয়ে সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। এ যেন অবিকল প্রেসিডেন্ট জিয়া।
গাড়ি চলছে, আমি তারেক ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম আর শহীদ জিয়ার প্রতিচ্ছবি মনে মনে ভাসতে থাকল। কচুয়ার জনগণ বাঁধভাঙা পানির মতো উপচে পড়তে থাকল তারেক ভাইয়ের দিকে। তিনি সঠিকভাবেই সামাল দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন। এদিকে আমি বেবীর কাছ থেকে সাচার মাঠের অবস্থা জানতে চাইলে উত্তরে জানাল যেতে পারছি না কারণ সবাই ভেবেছে এটাই তারেক ভাইয়ের গাড়ি, রাস্তায় বারবার থামাচ্ছিল। ক্রমান্বয়ে আমার অস্থিরতা বেড়েই চলছে। তারেক ভাই আবার রসিকও বটে। কারণ তিনি আগেই আমাদের বলেছেন, যে এলাকায় অনুষ্ঠান ভালো হবে সে এলাকাকে পুরস্কৃত করা হবে। ভাইয়ার চালানো গাড়ি এগিয়ে চলছে, হঠাৎ হঠাৎ যখন বন্যার ঢলের মতো মানুষ এগিয়ে আসে তখন নিরাপত্তার কারণে আমরা অতি সাবধানতা অবলম্বন করতাম, তিনি নিরুৎসাহিত করতেন। আমাকে বললেন, সবাইকে আসতে দিন আমি সবার সঙ্গে হাত মেলাতে চাই।
এরই মধ্যে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। খাবারের আয়োজন হয়েছে কচুয়া ডাকবাংলোয়। তিনি বললেন, বসে খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না। তাই রাস্তায় খাবার আনা হলো। মনোহরপুর গ্রামের পরই একটু নির্জন জায়গায় তিনি গাড়ি থামিয়ে দিলেন। আর দ্রুত ভোজনশীল রুটির ভিতর সবজি দিয়ে অপুকে বললেন মুখে তুলে দিতে। যেন সময় নষ্ট না হয়। কচুয়ায় মিটিং শেষ করে বাসাইয়া গ্রামের মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক হিন্দু মহিলা কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা আর উলুধ্বনি নিয়ে বরণ করে নিলেন তারেক ভাইকে। সেই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ সংযোগের তারটি দূর দিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে বললেন ঠিক করে দিতে। যখন তিনি হিন্দু মহিলাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আমার অনুভূতি হলো, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আর পাহাড়ি জনপথ নিয়েই হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। হঠাৎ করেই পথিমধ্যে পালাখাল মোড়ে প্রতিবন্ধী ছেলে সামনে এসে হাজির; যাকে আমি সব সময় কিছু না কিছু দেই। সে আসতেই আমি বিরক্ত হলাম। আজ না হয় সে কিছু না চাইতে পারত, সে কিছু চাওয়ার আগে আমি পকেট থেকে টাকা দিতেই সে বলল, মিলন ভাই আমি টাকা চাই না তারেক ভাইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে চাই। সে রাস্তায় শুয়ে আছে দাঁড়াতে পারে না তারেক ভাই গাড়ি থামিয়ে নেমে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, এদের জন্য কিছু করতে হবে। এর কিছু দিন পরই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পেলাম। এ ধরনের প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইল রিকশা বানিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলো।
সাচার বাজার এসে দেখি এ যেন জনসভা নয়, জনসমুদ্র! কোথা থেকে এত জনসমাগম হয়েছে, শুধু মানুষ আর মানুষ। তাকিয়ে দেখি, পেছনে ব্যানার নেই। রাগ করে বেবীর কাছে জানতে চাইলে বলল, পেছনের লোকজনের আপত্তিতে তারেক ভাই তা সরিয়ে দিয়েছেন। কী যে এক অসাধারণ জনসভা। মনে মনে ভাবছি, এ যেন সত্যিই জিয়া জুনিয়র। আল্লাহ যেন আপন হাতে বাংলাদেশের কাণ্ডারি বানিয়েছেন।
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তারেক রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় দেশের কয়েকজন প্রথিতযশা সাংবাদিকের সামনে তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য রাজনীতি করি। এ জন্য যদি জেলখানায় যেতে হয় যাব। আমি শহীদ জিয়াউর রহমানের ছেলে। যারা বিএনপি তথা জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরোধী, তারাই ওসব অপপ্রচার করে। আপনারা জেনে দেখুন, আমি কোনো মন্ত্রী বা কোনো সচিবকে কোনো কাজের জন্য টেলিফোন করেছি কিনা, আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি কেউ বলতে পারবেন না। আমার বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার ষড়যন্ত্রমূলক।’ তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সবাই, দেশের মানুষও তাই চায়। কিন্তু যেভাবে কেবল বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঢালাও অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা কোনোভাবেই এ দেশের শান্তিকামী মানুষ মেনে নেবে না। কারণ বিএনপি দেশের মানুষের প্রাণের দল। এই দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু জনগণ তার জবাব দিয়েছে। তারেক রহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি কারাগারে যেতে প্রস্তুত?’ জবাবটা ছিল, ‘রাজনীতি করি, যদি এ জন্য জেলে যেতে হয় তাতে আক্ষেপ নেই। তবে ভিত্তিহীন কোনো অভিযোগে যদি আমাকে এমনটা করা হয় এর বিচারের ভার দেশের মানুষের কাছে থাকবে।
মনে মনে ভাবলাম, তাই তো ১/১১’র ষড়যন্ত্রকারীরা ও তাদের বর্তমান দোসররা ধ্বংস করতে চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাংলাদেশের কাণ্ডারি তৃণমূল থেকে উঠে আসা তারুণ্যের অহঙ্কার তারেক রহমানকে। যার পিতা নিজ গুণে স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে দেশের চরম দুর্দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়ে শাহাদাতবরণ করেন, যার মা নাবালক দুটি সন্তানকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করতে করতে ভঙ্গুর জাতীয়তাবাদী দলের কাণ্ডারি হয়ে তিন তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাদেরই রক্ত ধাবমান তারেক রহমানের শিরা-উপশিরায়।