জীবনকে সুন্দর অর্থবহ পরিতৃৃপ্তিময় ও বিকশিত করার জন্য রোজার বিকল্প নাই — মোঃ মহসিন হোসাইন —

চলতি বছর মাহে রমজান এমন এক সময় এসেছে যখন সারা দুনিয়া করোনা ভাইরাস নামের মহামারীতে আক্রান্ত। এ মহামারী ইতিমধ্যে প্রথম মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। আরও কত জীবন কেড়ে নেবে সে আশঙ্কায় ভুগছে প্রতিটি মানুষ। করোনা নামক মহামারি এই ভাইরাসের প্রকোপে দুনিয়া আক্রান্ত হয়ে কুপোকাত হয়ে আছে। এরকম একটা বিপর্যস্ত সময়ে আমরা পবিত্র মাহে রমজানের সম্মুখীন হয়েছি। করোনার এই দুঃসময়ের মধ্যেও কোটি কোটি মুসলমান রোজা পালন করছেন মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য।
ইতিহাসের মধ্যে এই প্রথমবার রমজান মুসলিমদের কাছে ভিন্ন রকম এক চিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। যখন সমস্ত পৃথিবীতে চলছে করোনা নামের এক নীরব যুদ্ধ। যে নীরব যুদ্ধ ইতোমধ্যে অনেক যুদ্ধকে হার মানিয়েছে। যার ফল স্বরূপ সকল মানুষ এখন ঘরবন্দি। দেশে দেশে চলছে লকডাউন ও কারফিউ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। পৃথিবীর ব্যস্ততম স্থানগুলোতে বিরাজ করছে পিনপুন নীরবতা। নেই মানুষের মাঝে কোলাহল ও পদচারণ। এমন বিমর্ষ ও অচেনা বিষণœ পৃথিবীতে ফিরে এলো মাহে রমজান। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি এবং মর্যাদাপূর্ণ অবশ্যপালনীয় ইবাদত রোজা। রোজা মানবদেহের জন্য কল্যাণকর তা আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে। রমজান একটি পবিত্র মাস। রমজানের রোজা মুসলমানদের উপর ফরজ। ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল’ (সূরা বাকারার, আয়াত ১৮৩)।
সিয়াম সাধনার মাস রমজান। দীর্ঘ ১১ মাস পর পর আসে পবিত্র মাহে রমজান। রহমত, মাগফিরাত, আর নাজাতের বারতা নিয়ে আমাদের মাঝে আসে মাহে রমজান। ধনী, গরীব, উঁচুনিচু সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমাদের এক কাতারে নিয়ে আসে মাহে রমজান। রমজান শব্দটি আরবি রমজ ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ পুড়িয়ে ফেলা, দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া। সারা বছর আমাদের শরীর এবং মনের ওপর যে আবর্জনার আস্তর জমে তা পুড়িয়ে ফেলে সুস্থতা আর শুদ্ধতার সন্ধান দেয় রমজান। রোজা হচ্ছে দ্বিমুখী- দেহশুদ্ধি এবং অন্তরশুদ্ধি। না খেয়ে থাকাটা রোজার একটা অংশ। রোজার আরেকটি অংশ হলো- গীবত, রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, ঈর্ষা অর্থাৎ যে অন্যায় মানুষের মনকে কলুষিত করে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং মানুষের পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক চাহিদার মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা। রোজা মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে সফলতার স্বর্ণশিখরে আরোহন সহ সংযমী করে।
রমজানের আগমনে খুলে দেয়া হয়েছে জান্নাতের সকল দরজা। বন্ধ হয়ে গেছে জাহান্নামের সবক’টা দরজা। শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়েছে শেকলে। এ মাসে এমন একটি রজনী রয়েছে- যা অন্য হাজার মাসের থেকেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ মাসের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে যেন (জীবনের) সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল।’ রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের রমজানের সুসংবাদ শোনাতেন। রমজানের মর্যাদার কথা বলতেন। ইবাদত ও সাধনায় মনোযোগী হওয়ার উপদেশ দিতেন। বেশি বেশি নেকি অর্জনে উৎসাহ জোগাতেন। আমাদের কর্তব্য হল, ইবাদতের বসন্তকাল রমজান মাস কে যথার্থ মূল্যায়ন করা। তার প্রাপ্য সম্মান দেয়া। রমজান মাস দুহাত ভরে পাওয়ার মাস। কারণ, আমরা যদি এর উপযুক্ত মূল্য দিতে না পারি, জান্নাত লাভের এমন সুযোগকেও হাতছাড়া করে ফেলি, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে জীবনে রমজান মাস পেল কিন্তু তার ভুল-ত্রুটি অন্যায় পাপাচার থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না, নিশ্চয়ই এ জগতে তার চেয়ে বড় হতভাগা আর কে হতে পারে! রোজাকে আল্লাহ নিজের দিকে সম্বোধিত করে বলেছেন, ‘মানুষের সব আমল তাঁর জন্য; তবে রোজা ছাড়া। কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের চেয়ে বেশি সুগন্ধি যুক্ত’ (বুখারি)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘রোজা ঢাল স্বরূপ, যতক্ষণ তা ত্রুটিযুক্ত করা হয়’ (সুনানে নাসায়ি)। সে জন্য রোজার মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযমের শিক্ষা পায়। এ সংযম মানুষকে শুদ্ধচারী হওয়ার পথ দেখায়। এছাড়া তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা এবং এটা রোজার অন্তর্নিহিত প্রধান তাৎপর্য। কেননা ঘরে খাদ্য থাকতেও রোজা পালনের সময় সেই খাদ্য গ্রহণ থেকে মুমিনরা দূরে থাকে। আল্লাহর প্রতি ভয় তাদের দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানীয় থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
রোজার এক মাস মুমিনদের জীবন পুরোপুরি আল্লাহ মুখী হয়। একেবারে প্রত্যুষে সাহরি খাওয়া, তারপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবির পাশাপাশি অনেকে দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলে কোরআন তিলাওয়াত করে সময় কাটায়। রোজার মাসে আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। রাসুল(সাঃ) শাবান মাস থেকেই সিয়াম বা রোজার প্রস্তুতি নিতেন। শাবান মাসে তিনি বেশি বেশি রোজা রাখতেন। সাহাবিদেরও উদ্বুদ্ধ করতেন। যাতে রোজার মাসে রোজা থাকতে তাদের কষ্ট না হয়। একবার শাবান মাসের শেষ দিন রাসুল(সাঃ) সাহাবায়ে কিরামের এক মাহফিলে ভাষণ দান করেন।
ভাষনে তিনি মহান আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করার পর বললেন, হে মানুষ সকল! এক সুমহান মাস তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করেছে। এ এক মুবারক মাস। এ মাসের মধ্যে এমন এক রাত রয়েছে যা ১ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ এ মাসে রোজা রাখা ফরজ করেছেন। আর এ মাসে রাতের কিয়াম নফল করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এ মাসে আন্তরিকতা সহকারে নফল কাজ করে সে যেন অন্য মাসে ফরজ কাজ করে। যে এ মাসে একটি ফরজ কাজ সম্পাদন করে সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ কাজ করে। এ মাস সবর ও ধৈর্যের। সবরের বিনিময় হলো জান্নাত। এ মাস সহানুভূতির। এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি পায়। যে এ মাসে রোজাদারকে ইফতার করায়, তার গুনাহ মাফ হয় এবং তার ঘাড় দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ লাভ করে। রোজাদারের জন্যও অনুরূপ সওয়াব রয়েছে। রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই হ্রাস করা হয় না।
রাসুল (সাঃ) এর এ ভাষণ শোনার পর সাহাবায়ে কিরাম আরজ করল, হে রাসুলুল্লাহ! রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ্য আমাদের প্রত্যেকের নেই। এর উত্তরে তিনি বললেন, যে এক ফোঁটা দুধ বা একটি খেজুর বা সামান্য পানির দ্বারা রোজাদারকে ইফতার করায়, আল্লাহ তাকেও এ সওয়াব দান করেন। যে রোজাদারকে পেট ভরে খাদ্য দান করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন হাউসে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন এবং জান্নাতে না যাওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তির কোনো পিপাসা লাগবে না।
রমজান মাসে মহান প্রভু তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে প্রত্যেকটি ভালো কাজের সওয়াব বা বরকত ৭০ গুণ বা তার বেশি পরিমাণ দিয়ে থাকেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ মাস খাদ্য সংযমের মাস, পরিমিতিবোধের মাস, আত্ম উপলব্ধির মাস। কিন্তু বেনিয়াদী পুঁজিবাদীদের দিয়ে প্রভাবিত হয়ে আমরা অনেকে ভোগের উৎসবে মেতে উঠি। সংযমী হয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধির চেয়ে খাবারে, কেনাকাটায় বা আচরণে অসংযম, আসক্তি বা অস্থিরতা এখন দৃশ্যমান। আমরা যেন এ অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত না হই। আমরা যত সঙ্কটেই পড়ি না কেন, মহামারী করোনার বিপদ-আপদ পেরিয়ে শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমরা যেন সিয়াম সাধনা থেকে বঞ্চিত না হই।
রোজা মাস আসলেও আমাদের অনেকের মধ্যে কোনো রকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা রোজা রাখা সত্ত্বেও নামাজ পড়েন না। সচরাচর সময়ের মতো ইবাদত বন্দেগীর প্রতি তারা উদাসীন থাকেন। এগুলো উচিত নয়। ক্ষমা পাওয়ার মাস এই মাহে রমজান। নিজেকে জান্নাতের উপযোগী করে গড়ার মাস এই মাহে রমজান সেজন্য হেলায় না কাটিয়ে ইবাদত করে সময়কে কাজে লাগানো উচিত। আমাদের তরুণদের মধ্যে কিছু প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, তারা সারাদিন উপোষ থাকাকেই রমজান হিসেবে ধরে নেয়। আবার বন্ধুরা মিলে নানা জায়গায় রেষ্টুরেন্টে গিয়ে একসাথে ইফতার করার নামই তাদের কাছ রোজা। অনেকেই সারাদিন সিনেমা দেখে গান শুনে আবার গেইম ও খেলে এবং দিনশেষে নিজেকে রোযাদার দাবি করে। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
আমরা ইবাদতের মাধ্যমে এ মাসের দিন-রাতগুলো কাটানোর প্রস্তুতি নেব। দ্বিগুণ উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমল করব। জীবনকে সুন্দর অর্থবহ পরিতৃপ্তিময় ও বিকশিত করার জন্যে রোজার বিকল্প নাই। এ মাসের প্রথম ১০ দিন রহমতের, মাঝের ১০ দিন মাগফিরাত এবং শেষ ১০ দিন দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ লাভের। এ মাসে যে ব্যক্তি তার অধীনদের কাজ হালকা করে দেয়, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন এবং দোজখ থেকে নাজাত দান করেন। আমরা করোনার এই দুঃসময়ে গবির-দুঃখীরা যাতে সাহরি ও ইফতারের তৌফিক লাভ করে তা নিশ্চিত করতে তাদের পাশে দাঁড়াব। আল্লাহর কাছে বিশ্ববাসীকে করোনা ভাইরাসের থাবা থেকে মাফ করার প্রার্থনা জানাব। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ সহ সকলকে করোনা নামক এই মহামারি থেকে হেফাজত করুন। রমজান মাসে আবার পুরো পৃথিবী আগের মতো শান্ত হয়ে যাবে সুস্থ হয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক পরিচিতিঃ
মোঃ মহসিন হোসাইন।
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক- বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।
সাধারণ সম্পাদক- মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।
পরিচালক- পথের শিশুর পাঠশালা ও মানবতার ডাক একাডেমী।