নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণের পর খুনের অভিযোগে মামলা, ৩ আসামী জেলে, দেড় মাস পর হাজির সেই কিশোরী!

কচুয়ারডাক ডেস্ক রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্রী (১৪) নিখোঁজ হওয়ার ৪৫ দিন পর ফিরে আসায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা কিশোরী নিখোঁজের ঘটনায় তিন যুবককে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ‘পুলিশি নির্যাতনে গণধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত বলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিন যুবক’ এমন অভিযোগ স্বজনদের।

জবানবন্দি দেয়া তিন যুবকের স্বজনরা বলছেন, ওই কিশোরীকে হত্যা করা হয়নি। তাকে কেউ নির্যাতনও করেনি। সে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে বিয়ে করেছিল ওই কিশোরী। অথচ তাকে অপহরণের দায়ে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশ নির্যাতন করে গণধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত বলে তিন যুবকের স্বীকারোক্তি নেয়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত না করে তিনজন নিরীহ যুবককে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। পুলিশের সাজানো গল্প-কাহিনি অনুযায়ী আদালতে জবানবন্দি দেন তিন যুবক।

সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ মডেল থানার সামনে কিশোরী অপহরণের মামলায় গ্রেফতার আব্দুল্লাহ, তার বন্ধু রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলের স্বজনরা এসব অভিযোগ করেন।

এদিকে, গণধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে তিনজন যুবকের জবানবন্দি দেয়া এবং স্কুলছাত্রী উদ্ধারের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার জাহেদুল আলমের নির্দেশে সোমবার দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে ঘটনার প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটনে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে (ডিবি) প্রধান করে ও সহকারী পুলিশ সুপারকে (ট্রাফিক) নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জাহেদুল আলম বলেন, ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর। তাই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার স্কুলছাত্রী ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন স্কুলছাত্রীর বাবা। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় স্কুলছাত্রীর বাবা অপহরণ মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)। ওই দিনই তাদের গ্রেফতার করা হয়। একই ঘটনায় দুইদিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)।

গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয় আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। অথচ ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে। সে নিজে তার মাকে একটি ফোন ফ্যাক্সের দোকান থেকে কল করে চার হাজার টাকা চায়। পরে তার বাবা-মা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান। পরে স্কুলছাত্রীকে নিয়ে তারা থানায় হাজির হন। তাদের সঙ্গে ছিল কিশোরীর স্বামী ইব্রাহিম। তাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের স্বজনরা বলছেন, পুলিশি নির্যাতনে গণধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তারা। পুলিশ এ ঘটনা সাজিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন আমাদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার টাকা নিয়েছেন।

গ্রেফতার আব্দুল্লাহর মা শিউলী আক্তার বলেন, আব্দুল্লাহ ওয়ার্কশপে কাজ করতো। আমার ছেলের একটি বক্তব্য ছিল, আমি তার (স্কুলছাত্রী) সঙ্গে ঘুরেছি। এরপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। বিনা কারণে আমার ছেলেরে এত কিছু সহ্য করা লাগছে। গণধর্ষণের পর হত্যা করা মেয়ে জীবিত ফিরে এলো কীভাবে? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীমকে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রথমে যখন ছেলেরে ধরে আনে তখন নির্যাতন যাতে না করে সেজন্য সাত হাজার টাকা দিয়েছি। পরে আরও তিন হাজার টাকা দিয়েছি। টাকা না দিলে ছেলেরে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন এসআই শামীম।

গ্রেফতার হওয়া নৌকার মাঝি খলিলের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, সন্দেহ করে আমার স্বামীরে ধরে এনেছে পুলিশ। পরে পুলিশ বলছে, ওই মেয়েরে নাকি আমার স্বামী মেরে ফেলেছে। এখন তো দেখতাছি ওই মেয়ে বেঁচে আছে। আমার স্বামীরে কেন পুলিশ ফাঁসাইলো সেটি আমি জানতে চাই।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছোটবেলায় মা-বাপকে হারিয়ে আমি এতিম। স্বামী কাজ না করলে না খেয়ে থাকি। গত কয়েকদিন তিনটা মেয়ে নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।

শারমিন আরও বলেন, টাকা না দিলে জেলে দেবে বলেছিলেন শামীম স্যার। টাকা না দেয়ায় আমার স্বামীরে সারারাত ঝুলিয়ে পিটাইছে। এই কথা শোনার পর আমি অনেক কষ্ট করে সাত হাজার টাকা দিছি। আমার স্বামীরে যেন না মারে। কিন্তু আমার স্বামীরে ফাঁসিয়ে দিলেন শামীম স্যার। আমার স্বামী নির্দোষ, তারে ছাইড়া দেন। এই কথা বারবার পুলিশরে বলছি। তখন আমারে কইলো, বেশি কথা বইলো না। বেশি কথা বললে সবাইরে জেলে ঢুকাইয়া দিমু।