বাঙ্গালীর প্রাণের প্রাণ বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার মাস জানুয়ারী -দীপক চৌধুরী !

বাঙ্গালীর প্রাণের প্রাণ বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার মাস জানুয়ারী -দীপক চৌধুরী !

দীপক চৌধুরীঃ আজকের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রা, নারী ক্রিকেটের অগ্রযাত্রা, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, যোগাযোগ অগ্রযাত্রা, আমাদের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাই ওভার অর্থাৎ আমাদের সকল অগ্রযাত্রার মূলে কেবল বাঙালির প্রাণের প্রাণ বঙ্গবন্ধু জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে না দিলে আজ আমরা কোথায় থাকতাম? জীবনভর সংগ্রাম করেছেন এদেশের মানুষের স্বার্থে। সোনার বাংলা তৈরি হয়েছে তাঁর প্রিয় বাঙালির জন্য, বাঙালির জাতির চোখ-মুখ-ভাষা তিনি জানতেন।

এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’-এর ৫০ বছর পূর্তি। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এখন যারা সুশাসন, গণতন্ত্র, সুবিচার নিয়ে হাহাকার করছেন, পত্রিকায় কলাম লিখছেন, টেলিভিশনের আলোচনা বা টকশোতে ঝড় তুলছেন তারা বাংলাদেশের অতীত সম্পর্কে একটি কথাও স্মরণ করতে চান না। বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল সাহেব ও তার চিন্তার সমমানের রাজনৈতিক নেতারা ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে হাঁ-হুতাশ করতে পারেন। এখন তারা গণতন্ত্রের জন্য চোখের জল ফেলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। মায়াকান্না করছেন। তারা গণতন্ত্র, মানবিকতা, সুশাসন, সুবিচারের ছিটেফোঁটাও দিতে পারেননি। এখন পত্র-পত্রিকায় ইনিয়ে-বিনিয়ে যারা কলাম লিখেন বা টকশোতে যারা গলা শুকিয়ে ফেলেন তারা কারা? আসলে, গণতন্ত্রের সঙ্গে বিএনপির কখনো দেখা হয়নি। কারণ, বিএনপি নামের দলটির জন্মই নিয়েছিল অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। জনগণের সঙ্গে দলটির কখনো বা কোনোকালেই কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। অস্ত্রের মুখে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ করা ছিল এদের পূর্বসুরি নেতাদের কাজ। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্র হত্যার খেলায় মজেছিল দলটির নেতারা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের মানুষের ওপর কতগুলো বছর তারা অত্যাচার চালিয়েছিল এর হিসেব একটিবার করা দরকার।

এখন, মানবিক দৃষ্টি দেখানোর জন্য ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যে রাজনীতির উর্ধ্বে ওঠে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে হবে। হাঁ, দেখাতে হবে। আমরা সবাই জানি, ১০ বছর এ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদার সুচিকিৎসা হোক আমরা চাই। কিন্তু যারা মানবিকতা দোহাই তুলে জিগির করছেন অন্য উদ্দেশে তারা কারা? আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল আর বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন মানবিকতা কোথায় ছিল? আইনের শাসন, গণতন্ত্র, সুবিচার কোথায় ছিল? সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়ে এদেশের সংখ্যালঘুরা কী নির্মমতার মুখোমুখি হয়েছিল। খালেদা জিয়ার শাসনামলের দুঃশাসনের কথাগুলো কোনোদিনই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভুলতে পারবে না। বিচারের বানী নিভৃতে কেঁদেছে।

আজকের বাংলাদেশের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভারসহ অগ্রগতি, উন্নয়ন আর গণমানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন যারা চোখে দেখে না তারা গণতন্ত্র খুঁজে পাবে কীভাবে? একজন মানুষ কতটা অমানবিক হলে রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎ দিবসে ভুয়া জন্মদিনের উৎসব করেন। ১৫ আগস্টের ভুয়া জন্মদিন পালন ছিল নিষ্ঠুর রসিকতা। এদিন আমাদের জাতীয় শোক দিবস। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার বিয়োগান্তক দিন। দেশের রাজনীতিতে এবং জনগণের সাথে কতটুকু মানবিক আচরণ করেছিলেন তিনি? এর মানে এই নয়, আমি খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য বিদেশ গমনের বিষয়ে বিরোধিতা করে মন্তব্য করছি। অথচ বঙ্গবন্ধুর ডাকেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তাঁর নির্দেশেই মুক্তিযুদ্ধ। ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।
এটা নতুন করে বলার দরকার নেই যে, ঐতিহাসিক ১০ই জানুয়ারি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক ইতিহাসের একটি বিশেষ মাইলফলক। ১৯৪৭ সালে ভ্রান্ত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষকে নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে।

এটা প্রমাণিত যে, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ খ্যাত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের কালজয়ী নির্দেশনা ও আহ্বান এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতি।
আমরা সবাই জানি, ’৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করলে ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করে রাখে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে বাঙালি জাতি দখলদার পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে। বিশ্ব-মানচিত্রে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জিত হলেও বাঙালি জাতির বিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন।

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার মাধ্যমে সে বিজয় পূর্ণতা লাভ করে। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে লন্ডন-দিল্লি হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন বাঙালির ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এইদিন স্বাধীন বাংলার আকাশে সূর্যোদয়ের মতো চির ভাস্বর-উজ্জ্বল মহান নেতা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। স্বদেশের মাটি ছুঁয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা শিশুর মতো আবেগে আকুল হলেন। আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা নামলো তাঁর দু’চোখ বেয়ে।
প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ-বাতাস। জনগণনন্দিত শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ধ্রুপদি বক্তৃতায় বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’

দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে বির্জয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে বাঙালি জাতি যখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাঙালি জাতির হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত করেছিল অনুপ্রেরণার দেদীপ্যমান আলোক শিখা। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা হিসেবে”। সেই থেকে প্রতিবছর কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি নানা আয়োজনে পালন করে আসছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক