রমজান মাস অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করার মাস ॥ — মোঃ মহসিন হোসাইন —

খোশ আমদেদ মাহে রমজান! আরবি বর্ষপঞ্জি তথা হিজরি সালের শাবান চান্দ্রমাসের সমাপ্তির পরই প্রতিবছর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসে ইবাদতের মাস রমজানুল মোবারক। এ গুরুত্ববহ তাৎপর্যময় মাসের আগমন সারা বিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করে দেয়। মুসলমানদের জীবনে সারা বছরের মধ্যে রমজান মাসে আল্লাহর অসীম দয়া, ক্ষমা ও পাপমুক্তির এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয় বলেই এ পুণ্যময় মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা এত বেশি। তাই বলা হয়, রমজান মাস হচ্ছে ইবাদত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকর, শোকর তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মৌসুম। মাহে রমজান এমনই এক বরকতময় মাস, যার আগমনে পুলকিত হয়ে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে মোবারকবাদ দিয়ে সুসংবাদ প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের সামনে রমজানের পবিত্র মাস এসেছে, যে মাসে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন।’ (মুসলিম)


‘রামাদান’ শব্দটি আরবি ‘রাম্দ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দহন, প্রজ্বলন, জ্বালানো বা পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ নিজের সমুদয় জাগতিক কামনা-বাসনা পরিহার করে আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রপূর্ণ জীবন-যাপন করে এবং ষড়্রপিুকে দমন করে আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে। রোজা মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মহিমান্বিত মাসের নাম ‘রমজান’।
রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতেন এবং রজব মাসের চাঁদ দেখে মাহে রমজান প্রাপ্তির আশায় বিভোর থাকতেন। শাবান মাসকে রমজান মাসের প্রস্তুতি ও সোপান মনে করে তিনি বিশেষ দোয়া করতেন এবং অন্যদের তা শিক্ষা দিতেন। সাহাবায়ে কিরাম শাবান মাসে আসন্ন রমজান মাসকে নির্দেশনা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে অতিবাহিত করার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। শাবান মাসের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিরা অধিক পরিমাণে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শুরু করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিরা হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করে যাকাত প্রদানের প্রস্তুতি নিতেন। প্রশাসকেরা কারাবন্দী লোকদের মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন শাবান মাসে উপনীত হতেন, তখন মাহে রমজানকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আবেগ ভরে আল্লাহর দরবারে এ প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ) তাই মাহে রমজানের অসীম কল্যাণ ও বরকত লাভের প্রত্যাশার জন্য দৈহিক ও মানসিকভাবে ইবাদতের প্রস্ততি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে মাহে রমজানের রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি একটি মহান মোবারক মাস ছায়া ফেলেছে। এ মাসে সহ¯্র মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রজনী আছে। যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো নেক আমল দ্বারা আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য সময়ে কোনো ফরজ আদায় করার মতো কাজ করল। আর এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো ফরজ আদায় করে, সে যেন অন্য সময়ের ৭০টি ফরজ আদায়ের নেকি লাভ করার সমতুল্য কাজ করল। এটি সংযমের মাস আর সংযমের ফল হচ্ছে জান্নাত।’ (মিশকাত)।
নৈতিক পরিশুদ্ধি ও আত্মগঠনের মাস হিসেবে মাহে রমজানের আগমনে সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমান নামাজ-রোজার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা, টুপি কেনেন অথবা ধুয়ে-মুছে পাক-পবিত্র করে রাখেন। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পাদন করে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়সহ রমজান মাসের বিশেষ খতমে তারাবি নামাজ জামাতে পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত, জিকর-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, দান-সাদকা করে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে সচেষ্ট হন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং যারা প্রতিশ্রুতি সম্পাদনকারী এবং অর্থসংকটে দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকি।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭)।
মাহে রমজান মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য বিশেষ উপহার। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, তার প্রথম অংশ রহমত, মধ্যমাংশ মাগফিরাত এবং শেষাংশ দোজখ থেকে মুক্তির। এ মাস আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমত, মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রাপ্তির, তার সান্নিধ্য হাসিলের। রমজানে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময় ন্যুনতম দশগুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হয়, বিতাড়িত শয়তানকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করা হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়। রমজানে আমলের বিশেষ পরিবেশ তৈরি করা হয়; মুসলমানদের ক্ষমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাই সুবর্ণ এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাকে সফল করতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া কাম্য।
মাহে রমজান উপলক্ষে সর্বপ্রথম মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমি অমূল্য এ মাসকে কীভাবে কাটাব? অন্য সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত কী করব? স্বাভাবিক আমলের অতিরিক্ত আমার আর কী আমল হবে, সে লক্ষ্য এখন থেকে নেয়া প্রয়োজন। আপনার লক্ষ্য আপনাকে তাড়া করে বেড়াবে। রমজানেও অন্যান্য সময়ের মতো কাজ-কর্ম থাকাই স্বাভাবিক, সেক্ষেত্রে যেসব কাজ আগে-পরে করা বা বাদ দেয়া যায় তা আগেভাগেই চিন্তা করে সেভাবে ব্যবস্থা নিয়ে রমজানে আপন কর্মপরিকল্পনা এভাবে নেয়া দরকার যেন ইবাদতের ভরবসন্তে বেশি সময় ইবাদতেই কাটে।
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) রমজানে ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধে লেগে যেতেন। রমজানে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা এবং রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়া তার প্রস্তুতিরই অপরিহার্য অংশ। ব্যক্তিপর্যায় থেকে নিয়ে পারিবারিক, সামাজিক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে রমজান উপলক্ষে গণসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
সম্প্রতি বিশ্বের অনেক জায়গায় রমজানের আগে গণসচেতনতার জন্য সেমিনার, র‌্যালী এবং ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশেও এসব হয়, তবে এর পরিধি আরও বাড়ানো যেতে পারে। রমজানকে সামনে রেখে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার, তার পবিত্রতা রক্ষার প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা ফলপ্রতি হবে নিশ্চয়। রমজান উপলক্ষে অনেক মিডিয়াই বিশেষ আয়োজন করে থাকে। বহু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সাহরি ও ইফতার অনুষ্ঠান করে থাকে। কোনো কোনো প্রিন্ট মিডিয়া বিশেষ পাতা বা দৈনিক কলামের ব্যবস্থা করে। এজন্য তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য নিঃসন্দেহে।
রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় দিনের বেলায় হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখা জরুরি। সরাসরি নিজে গুনাহ করা কিংবা অন্যকে গুনাহের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া সমান অপরাধ। হোটেল ব্যবসায়ীরা এক্ষেত্রে সমান গুনাহগার হবেন। দিনের বেলায় হোটেল বন্ধের কারণে হয়তো তারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তবে স্মরণ রাখতে হবে আল্লাহতায়ালা বরকত দিলে সে ক্ষতি পুষিয়ে যেতে পারে, আর তার পক্ষ থেকে বে-বরকতি হলে বহুগুণ লাভ করেও হয়তোবা ক্ষতির পাল্লাই ভারী হবে। মুমিনদের অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকা অপরিহার্য। তাই এ বিশ্বাস অনুপাতে আমল ঈমানের দাবি।
রমজান মাস মুসলমানদের নিয়মতান্ত্রিক পানাহার, চলাফেরা, ঘুমসহ নানা ইবাদত-বন্দেগিতে আধ্যাত্মিক জীবনে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বছর ভালোভাবে যাপিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রজনী আগমন করে, তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করেন, ‘হে কল্যাণকামী, এগিয়ে যাও! হে মন্দান্বেষী, স্তব্ধ হও!।’(তিরমিজি)। সুতরাং এ পবিত্র মাসে নামাজ-রোজা পালন তথা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি তথা সেহেরি, ইফতার, তারাবি, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, ইতিকাফ, তাহাজ্জুদ, জিকর-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, যাকাত-ফিতরা, দান-সাদকা প্রভৃতি আদায় প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যকর্তব্য।

লেখক পরিচিতিঃ
মোঃ মহসিন হোসাইন।
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।
সাধারণ সম্পাদকঃ মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।
পরিচালকঃ পথের শিশুর পাঠশালা।