রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন বীর মুক্তিযোদ্ধা সুফি সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব এ খোদা দেওয়ানবাগী ( র.) হুজুর, লাখ ভক্তের শোক!

কচুয়ারডাক ঢাকা ডেস্কঃ ঢাকা নিজ রওজায় শায়িত সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী (র.) সাদ আব্দুল্লাহ জারিফ কিংবদন্তি মহামানব, আল্লাহর বন্ধু, রাসুলুল্লাহর ( স.) প্রিয়জন, অলিদের বাদশাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুফি সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব এ খোদা দেওয়ানবাগী ( র.) হুজুরকে অদ্য মঙ্গলবার ২৯ ডিসেম্বর দুপুর ২ টায় ঢাকার মতিঝিল বাবে রহমত চত্ত্বরে জানাজা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পিছনে উটের খামার খ্যাত বাবে মদিনায় সদ্য তৈরি রওজা মুবারকে শায়িত করা হয়েছে। এর আগে আরামবাগে দুপুর ২.০৮ মিনিটের জানাজায় লাখো মানুষ শরিক হন। জানাজার ইমামতি করেন বড় সাহেবজাদা ইমাম ড. নুর এ খোদা ( মা. আ.)। দেওয়ানবাগী হুজুর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ৩নং সেক্টরে রিলিজিয়াস টিচারের পদে অধিষ্ঠিত হন। জানাজার পর মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া হয়। এদিকে গতকাল ২৮ ডিসেম্বর বাদ ফজর ৬.৪৮ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন তিনি। সুত্রে মতে, একই দিন রাত ১১ টার দিকে বুকের ব্যাথার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হয়। জানাজার আগে ৪ সাহেবজাদার পক্ষে ছোট সাহেবজাদা ইমাম ড. মঞ্জুর এ খোদা (মা. আ.) দেওয়ানবাগীর লিখিত অসিয়তনামা পাঠ করে শুনান। মেঝ হুজুর জানান, ২৭ তারিখ দুপুরে সম্পুর্ন সুস্থ অবস্থায় বাবাজান আমাদের ৪ ভাই ও ২ বোনকে অসিয়ত করেন, কিভাবে তাঁর তরিকা ও দরবার চলবে। সেঝ সাহেবজাদা ইমাম ড. ফজল এ খোদা (মা. আ.) তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাবাজান মেঝ সাহেবজাদা ইমাম আরসাম ড. সৈয়দ কুদরত এ খোদা ( মা. আ.) হুজুরকে দরবার পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে যান এবং আমি সবার পক্ষ থেকে এই অসিয়ত সমর্থন করছি। বড় সাহেবজাদাও কেয়ামত পর্যন্ত ৪ ভাই মিলেমিশে এই দরবার পরিচালনায় সহমত পোষণ করেন।
দেওয়ানবাগী হুজুরের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
এদিকে গতকাল বিকাল ৪টা থেকে অদ্য জানাজা অবদি মুরিদানগণ তাঁকে একনজর দেখতে দিকবিদিক ছুটে আসেন। বাদ যাননি এই প্রতিবেদকও। বিকেল ৪টায় তাঁর চাহারা দেখেন প্রতিবেদক। ইন্তেকালে যেন তিনি আরও নুরানি হয়ে ওঠেন!
দরবার শরিফ সুত্রে জানা গেছে, আগামি শুক্রবার, ১ জানুয়ারি ২০২১ করোনার কারণে ৪ দিনের কুলখানি ফেসবুক জুমে অনুষ্ঠিত হবে। এবং মেঝহুজুর সবাইকে বাসায়/খানকায় তাবারুকের আয়োজন করতে বলেছেন। এছাড়া ৪০তম দিবসেও কুলখানি হতে পারে।
১৯৪৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হযরত সৈয়দ আবদুর রশিদ সরকার (র.) ও মা সৈয়দা জোবেদা খাতুন (র.)। ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। জানা গেছে, ভাই -বোনদের সবাই তাঁর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। নিজ এলাকার তালশহর কারিমিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করেন তিনি।
ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া দরবারের প্রতিষ্ঠাতা মুজাদ্দেদিয়া তরিকার সিলসিলার জবরদস্ত মুজাদ্দিদ হযরত আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী (র.) এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন দেওয়ানবাগী। দেওয়ানবাগীর মেধা, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মরূপ অবলোকন করে শাহ চন্দ্রপুরী তাঁর আদরের মেয়ে হযরত হামিদা বেগম (র.) কে বিয়ে দেন দেওয়ানবাগীর নিকট। ১২ বছর সাধনার পর শ্বশুরের বদৌলতে আল্লাহ ও রাসুল (স.) কর্তৃক তরিকা প্রবর্তনের দায়িত্ব পান আখেরি জামানার এই বিশেষ মুজাদ্দিদ।
তাঁর ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে। প্রত্যেকে ধর্মতত্ত্বের ওপর পিএইচডি করেছেন। এছাড়া তাঁর পরিবারের ১৭ জন পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। তিনি একজন মহান শিক্ষানুরাগী।
তিনি আধুনিক সুফিবাদের জনক। মুহাম্মদী ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি সারাদেশে ১৮টি দরবার, অসংখ্য খানকা, মসজিদ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি একাধিক সংবাদপত্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও কুরআন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্বনামে রচিত তাফসীর গ্রন্থ ” তাফসীরে সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগীতে তিনি জগতে প্রথম বলেছেন, ‘ আল্লাহ নিরাকার নন, তাঁর নুরের রূপ আছে”। তিনিই দুনিয়াকে প্রথম জানিয়েছেন কুরআনের বাণী, ‘ নবিজি (স.) কখনও গরিব ছিলেন না, তিনি ধনি ছিলেন। ‘
স্পষ্টবাদি, সাহসী ও ব্যতিক্রমী ইসলামের এই মহান সংস্কারক দেওয়ানবাগীর ওফাতে সারা দুনিয়াজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁকে শেষ এক নজর দেখতে আসা নারী-পুরুষের কান্না, আহাজারি দেখে বুঝতে বাকি রইল না পীর-মুরীদির বিণা সুতার মালায় কি মায়া, কি বাতিন আছে!
এই প্রতিবেদক গত দুদিন ধরে দেওয়ানবাগ চত্ত্বরে আছে। ৩২ বছর ধরে হুজুর কেবলার কাছে থাকা এক খাদেম জানান, ‘তিনি মিস্টভাষি ছিলেন। মুছকি হাসি হাসতেন। কখনও রাগলে চেহারা লাল হয়ে যেত। তিনি অল্প আহার করতেন। গত ৪৫ বছর ধরে তিনি রাত ১০ টার দিকে ঘুমাতেন, রাত ৩ টায় রহমতের আমল করতেন এবং ফজর আদায় করে হাটতেন। রমাদানের ইফতার অন্যদের অর্ধেক খাওয়া না হতেই তিনি মাগরিবের নামাজের জন্য মসজিদে চলে আসতেন। তিনি আগতদের নালিশ মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, আপ্যায়ন করাতেন। তিনি খুব বিনয়ী, কোমল মেজাজের ছিলেন।’
জানাজায় আসা সুধিজন বলাবলি করছিলেন যে, আজ থেকে জ্ঞানপিপাসুরা দেওয়ানবাগীর দর্শন অনুসন্ধান করবে। কিয়ামত পর্যন্ত সাধকেরা ‘মুহাম্মদি ইসলাম তারিকা’য় দুনিয়ায় আল্লাহ ও রাসুলের (স.) দীদার পেতে উৎসুক হবে’।
বিগত ৪৫ বছর ইলমে তাসাউউফ তথা শরীয়ত-মারেফতের বাণি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে দেওয়ানবাগী হুজুর কতই না কাটার আঘাত সয়েছেন। কখনও তিনি কুৎসারটনাকারিদের কটুবাক্যটুকুও বলেননি। ভক্ত ও মুরিদদের কয়েকজন বলেছেন, তাঁর অফাত লাভের ফায়েজ বরকত যেন আমাদের মত পাপি -তাপীদের কলবের ময়লা ধুয়েমুছে নিয়ে যায়, এ দুরদই পাঠ করছি ওগো দয়াল মাওলা, দয়াল খোদা গো তোমার দরবারে!
(নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক আমার যুগ)