একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আ’লীগের ব্যাপক প্রস্তুতি

উত্তরকন্ঠ নিউজ ডেক্স:
দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা হওয়ার পরে রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন না এনে আগামী নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে পুরানো পথেই হাঁটতে চায় আওয়ামী লীগের হাইকমাণ্ড।
এজন্য অন্য কোনো দিকে নজর না দিয়ে ভোটেই মনোযোগ রাখতে চায় তারা। সেই লক্ষ্যে পুরানো পরিকল্পনা অনুয়ায়ী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে সংগঠনকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজশাহী, খুলনা ও ঢাকার জনসভাকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে জোরেশোরে প্রস্তুতি চলছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১ মার্চ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে।
ঢাকার বাইরের জনসভা সফল করতে দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট জেলা সফর করছে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। আর ৭ মার্চ ঢাকার জনসভাকে সফল করতে রোববার সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম ও ঢাকার আশপাশের জেলার নেতাদের পাশাপাশি এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করে সর্বোচ্চ জমায়েত ঘটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মার্চ থেকেই শুরু হবে পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণের কাজ।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য রাজনীতি করে। তাছাড়া প্রতিটি দলের নিজস্ব কিছু স্ট্যাটাস থাকে। অন্য দলের কর্মকাণ্ড দেখে কেউ স্ট্যাটাস ঠিক করে না। আর রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্য থাকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে জনগণের জন্য কাজ করা। আওয়ামী লীগও সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। এখানে বিএনপি কী করলো বা করবে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই। সবাই যে যার রাজনীতি করে। বিএনপি বিএনপির রাজনীতি করে আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। আমরা আমাদের পুরানো পথেই আছি। নির্বাচনের পথেই আছি। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় আসেনি।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা সরকারের কোনো হাত নেই। আর মামলাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের। কাজেই সরকারের ওপর দোষারোপ করা ঠিক নয়। মানুষ এখন সচেতন। এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসব মিথ্যাচার করে বিএনপি খুব বেশি লাভ করতে পারবে না।
আওয়ামী লীগের পুরো মনোযোগ এখন আগামী নির্বাচনকে ঘিরে। ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচন হবে, সেই হিসেবেই দল অগ্রসর হচ্ছে। তারা আরও বলেন, এরই মধ্যে আমাদের ১৫টি টিম সারা দেশে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
৩০ জানুয়ারি সিলেটের জনসভা থেকে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসভা করে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজশাহী যাবেন ভোট চাইতে। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে দফায় দফায় সফর করছেন জনসভা সফল করতে। এছাড়া ৩ মার্চ খুলনায় ও ৭ মার্চ রাজধানীতে জনসভা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে জনসভা হলেও মূলত আগামী নির্বাচনের জন্য এটিই হবে ঢাকার নির্বাচনি জনসভা। এই লক্ষ্যে রোববার ধানমণ্ডির একটি কমিউনিটি সেন্টারে দলটির ঢাকা মহানগর, ঢাকা জেলাসহ এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো, সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতা ও এমপিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ৭ মার্চ সর্বকালের বড় জমায়েত ঘটানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ৭ মার্চ আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করব। আমরা এই জনসভায় নবজাগরণ দেখাতে চাই। আমরা আশা করছি, স্মরণকালের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে। ঢাকা মহানগর ও জেলা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বিভিন্ন শোভাযাত্রাসহ এ জনসভায় যোগ দেবেন। জনসভায় আসার জন্য বাস ছাড়াও ট্রেনের ব্যবস্থা করবে আওয়ামী লীগ।
জনসভা সফল করতে সবাইকে এখন থেকেই কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। তিনি বলেন, ৭ মার্চের সভা সফল করতে এখন থেকেই কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক। আজ থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করব। জমায়েতের পাশাপাশি এই জনসভার প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছাত্রলীগকে। ১ থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী এই দায়িত্ব পালন করবে বলে জানান ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য বলেন, আমরা এখন একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি তা হচ্ছে আগামী নির্বাচনের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করে নির্বাচনে জয়ী হওয়া। সেভাবেই আমরা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমাদের সাংগঠনিক সফরও শুরু হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ১৫টি টিমে ভাগ হয়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফর শুরু করেছেন। ওই সফরের মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং স্থানীয় এমপিদের কীভাবে জনগণের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছেন। সরকারের টানা ৯ বছরের উন্নয়ন জনগণের সামনে তুলে ধরছেন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে কয়েক দিন ধরেই আমি ফরিদপুরে অবস্থান করছি। সাংগঠনিক সফরের অংশ হিসেবে শনিবার এখানে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সাজেদা চৌধুরী, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, দীপু মনি, আবদুর রহমানের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১ মার্চ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৮ মাসব্যাপী এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২ লাখ কর্মীকে পোলিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের ১ম পর্যায়ের কাজ শুরু হবে ১ মার্চ। মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে প্রথম পর্যায়ে। ২য় পর্যায়ে ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু হবে ১৫ থেকে ২৮ মার্চ ৭টি বিভাগে। এই পর্যায়ে বিভাগীয় পর্যায়ের জেলাভিত্তিক মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১৫ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তৃতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে জেলা সদরে। এ পর্যায়ে নির্বাচনি আসন ও উপজেলাভিত্তিক পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ৪র্থ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ হবে নির্বাচনি এলাকা বা উপজেলা সদরে।
এ পর্যায়ে ভোট কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পঞ্চম পর্যায়ে হবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পোলিং এজেন্টদের সমন্বয় সভা। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগ (অক্টোবর) পর্যন্ত এ পর্যায়ের কার্যক্রম চলবে। ৬ষ্ঠ ও শেষ পর্যায়ে প্রশিক্ষপ্রাপ্ত পোলিং এজেন্ট এবং মাস্টার ট্রেইনারদের নিয়ে নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে আসনভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

128 total views, 1 views today

মন্তব্য করুন।

Please enter your comment!
Please enter your name here