নির্বাচনী হাওয়া—– চাঁদপুর-১(কচুয়া) আসনে আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব ।। স্বস্তি নেই বিএনপিতেও—

কচুয়া ডাক :
কচুয়া উপজেলা ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-১(কচুয়া) আসন। বর্তমানে এ আসনে সংসদ সদস্য ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তবে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনের মধ্যে তার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দু’জনেরই আলাদা বলয় তৈরি হয়েছে। কার বলয় কতটা শক্তিশালী, তার ওপর ভিত্তি করেই আগামী নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন নির্ধারিত হতে পারে। তবে এখানে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অবস্থান রয়েছে শক্তিশালী। রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে পারে বিএনপি ও জাপা।

চাঁদপুর-১(কচুয়া) আসনের ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৭৩ জন।২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২য় বারের মত সংসদ সদস্য হন ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর।এবার ও তিনি আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

কচুয়া উপজেলা ছিল একসময় চাঁদপুর জেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন উভয়েই এ উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক চরম বৈরী হওয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এখানে প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এখানে বিভিন্ন কারণে বিএনপির আধিপত্য অনেকটাই কমে এসেছে। এতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতও কমেছে।

ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে অনেক আগে থেকেই সারাদেশে সুপরিচিত। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হন তিনি। এহছানুল হক মিলন তখন ওই আসনের এমপি হলেও মূলত মহীউদ্দীন খান আলমগীরের উদ্যোগেই ১৯৯৮ সালের ১০ মে পৌরসভা হিসেবে কচুয়ার যাত্রা শুরু হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর বিএনপির রোষানলে পড়ে অনেক মামলায় কারাবরণ ও নির্যাতিত হন। একদিকে মন্ত্রী ও এমপি থাকার সুবাদে উন্নয়ন কার্যক্রম সংঘটিত করায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণে নির্যাতিত হওয়ায় তিনি যেমন আলোচিত, তেমনি জনপ্রিয়।

কচুয়া উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন বলেন- দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই নেতা তাদের কাছের মানুষ। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি নানা অবদান রেখেছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন কিছু বিতর্কিত বক্তব্য ও কার্যক্রম এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিলনের বিরুদ্ধে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে তার নামে। যদিও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তিনি এখনও জনপ্রিয়।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি বলেন, কচুয়ার মানুষ তাঁকে চায়। তারা তাকেই ভোট দেবে। কারণ, তিনি কচুয়ার জন্য অনেক কিছু করেছেন। নৌকা তথা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে তিনি জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজ করে চলেছেন। তিনি আরো বলেন, তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ার পিছনে তিনি কোনো কারণ দেখছেন না।

আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুব আলী পাটওয়ারী, সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন চৌধুরী সোহাগ ও ঢাকাভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত ছাত্রলীগ নেতা মহিবুল্লাহ মাহী।

অবসরে যাওয়ার পর গত দু-তিন বছর এলাকায় গণসংযোগ করছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন। তিনি চাকরি ছাড়ার পর থেকেই গত দু-তিন বছর নিজেকে প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে তিনি ভোটারদের কাছে একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। হাশিমপুর মিয়াবাড়ীর এই সন্তান এরই মধ্যে দলে একটি নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেছেন। যারা তার জন্য প্রচারণাও চালাচ্ছে। কয়েকবার দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার এই নেতা এলাকায় একটি মহিলা কলেজ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ নানা সমাজকর্মের সঙ্গে বহুদিন ধরে জড়িত আছেন।

এ প্রসঙ্গে গোলাম হোসেন বলেন- তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এনবিয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এলাকায় এসে কাজ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও তিনি তার নিজের কাজ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে আশাবাদী।তবে দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

চাঁদপুর-১(কচুয়া) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন মামলা-হামলার কারণে প্রায় দেড় বছর জেলে ছিলেন। দলটির বিভিন্ন নেতাকর্মীরা জানান- বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে মিলনের নামে চাঁদপুরের কচুয়া, সদর থানা, কুমিল্লার বিভিন্ন থানা ও ঢাকায় ৩৬টি মামলা হয়েছে। তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীও এসব মামলার বেশ কয়েকটির আসামি। এসব কারণে মিলন দেশ থেকে দূরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

একই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- আ ন ম এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) নাজমুন নাহার বেবী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য, মালয়েশিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মো. মোশারফ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি প্রকৌশলী আ হ ম মনিরুজ্জামান দেওয়ান মানিক, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম রফিকুল ইসলাম রনির স্ত্রী শামিমা আক্তার রনি ও লন্ডনপ্রবাসী বিএনপি নেতা মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মজুমদার।

বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, বিএনপি থেকে আ ন ম এহছানুল হক মিলনেরই মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা নিশ্চিত। কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবী মনোনয়ন পেতে পারেন। অন্যদিকে নবাগত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মনে করছেন, পুরনো নেতৃত্ব বিতর্কিত অবস্থানে রয়েছে বলে বিএনপির হাইহমান্ড মিলন বা তার আত্মীয়স্বজনকে মনোনয়ন নাও দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান মানিক কিংবা মোশারফ হোসেনের ভাগ্য খুলতে পারে।

এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও রেডিওলজি বিশেষজ্ঞ, চাঁদপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. শহীদুল হক এবং দলের নেতা ইমদাদুল হক রোমনের।

317 total views, 1 views today

মন্তব্য করুন।

Please enter your comment!
Please enter your name here