শেখ হাসিনার লন্ডন সফর বিএনপির তৃপ্তির ঢেঁকুর

কচুয়ার ডাকঃআওয়ামী লীগ কিংবা বাংলাদেশ সরকারের অংশ এই ব্রিটেনে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা করতে যতটুকু সফলতা দেখাচ্ছেন, তার চেয়ে বরং সফল বিএনপি কিংবা জামায়াতী গ্রুপ। কারণ সরকারের সুবিধাভোগীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতীরা সরকারবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশের ইমেজকে হেয় করতে পেরে এখানে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। স্বাভাবিকভাবেই জাতি হিসেবে তাদের এই অপপ্রচার আমাদের জন্য লজ্জার।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ব্রিটেনে আসেন, তার ক’দিন আগ থেকেই বাঙালিপাড়া প্রস্তুত হতে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতির অংশীদার মানুষগুলো যেন নতুন প্রাণ পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সম্মেলনে এসেছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই তার এ আগমনে লন্ডনের বাঙালিপাড়া যেন প্রাণ পেয়েছিল। ব্রিটেনে যারা সরকারি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কর্মী তাদের মাঝে একটা প্রাণচাঞ্চল্য জেগে উঠেছিল। কিন্তু তাদের সে প্রাণচাঞ্চল্যতা সবসময় মসৃণ হয়ে উঠে না। ব্রিটেন কিংবা ইউরোপ সফরে যখনই আসেন প্রধানমন্ত্রী, তখনই এখানকার রাজপথ কাঁপায় বিএনপি। সংসদের বাইরে হলেও বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিই। বাংলাদেশে বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না, যে কথাটা বলেন সরকারি দলের অনেক নেতাই। তাদের ভাষায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। ভেঙে গেছে তাদের ভিত। আর সে কারণেই আজকের বাংলাদেশে তাদের এই দুর্বল অবস্থান এবং সত্যি কথা হলো বাংলাদেশে বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না। বিএনপির দাবি প্রতিটি আন্দোলনের আগেই তাদের নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে। ভয়ে-আতঙ্কে তারা ছিটকে পড়ছে রাজপথ থেকে। সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ তাদের রাজপথে আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও বাংলাদেশের একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজনীতির কৌশল তারা পাল্টাতেই পারত। শুধু বিএনপির কর্মী দিয়ে ভোট আর গণতন্ত্রের আন্দোলন না করে কি তারা পারত না জনমুখী আন্দোলনে সাধারণ ছাত্র-শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা সারা বাংলাদেশেই অতিসম্প্রতি যে কোটা আন্দোলন হয়ে গেল, সেখানেও বিএনপি মূলত কোনো কিছুই করতে পারেনি। লন্ডন থেকে তারেক জিয়া আগুনের মাঝে ঘি ঢালতে চেয়েছিলেন। তার দলীয় একজন শিক্ষক নেতাকে দিয়ে আন্দোলন বেগবান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের নিজস্ব আন্দোলনে তারেক জিয়ার তত্ত্ব কোনো ছায়া ফেলতে পারেনি। বরং তাদের সাধারণ সম্পাদক কোটার আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে বলেন, গণতন্ত্রের আন্দোলন সার্থক না হলে কোনো আন্দোলন সার্থকতা পাবে না। অর্থাৎ সুর সেই একই, গণতন্ত্রের লেবাস পরিয়ে দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের রাস্তা খোঁজা।

আসলে বিএনপি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের দাবি-দাওয়াকে উপেক্ষা করে শুধু ক্ষমতার লড়াইকেই প্রাধান্য দিয়ে এগুচ্ছে। তাদের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা নেই। তাই তো গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন বলি আর কোটা আন্দোলন বলি কোনো আন্দোলনকেই তারা বিএনপি সমর্থিত কিংবা অংশীদার হতে পারেনি। তারা এসব দাবি-দাওয়ার পক্ষে কোনো সমান্তরাল আন্দোলনের পর্যন্ত ডাক দিতে পারেনি কোনো সময়ই। স্বাভাবিকভাবেই তাই যতটুকু দোষ তারা সরকারকে দিচ্ছে, ঠিক ততটুকু দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে, কারণ রাজনীতিতে তারা গণমানুষের দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে পারছে না, পারছে না তাই সাধারণ ছাত্র সমাজ কিংবা শ্রমিক কিংবা সাধারণ মানুষের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজধানীর বাইরে গিয়ে মানুষের দাবি-দাওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে।

২) ব্রিটেন কিংবা ইউরোপীয় ব্যবস্থায় আন্দোলন-সংগ্রামের কিছু নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা নিতেই পারে নাগরিকরা। ব্রিটেনে বাঙালিদের যেহেতু অধিকাংশই ব্রিটেনের নাগরিক, সেহেতু সেই নাগরিক সুবিধাটুকু নিচ্ছে সবাই। এখানে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সুযোগ পেতে পারে কোনো গ্রুপ কিংবা ভিনদেশি যে কোনো অভিবাসী। সেই সুযোগেই গত পাঁচ দিন লন্ডন যেন হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের নগরী। ‘যেখানেই হাসিনা সেখানেই প্রতিরোধ’- এই স্লোগানটি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রিটেনের বিএনপি। মূলত লন্ডনে অবস্থানরত তারেক জিয়ার প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই এসব কর্মকাণ্ড চলছে। অথবা আগামীতে সরকারের ক্ষমতা কিংবা সুবিধার অংশীদার হতে তারেক জিয়াকে খুশি করতে বিএনপির স্থানীয় নেতারাও অদ্ভুত সব কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। কাড়ি কাড়ি পাউন্ড খরচ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ তার সরকারের বিভিন্ন অপপ্রচারে তারা ট্রাক দিয়ে বাঙালিপাড়া এবং লন্ডনের প্রধান রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করিয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, মাত্র ক’দিন আগে লন্ডনে এসেছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ। সেখানেও সেই একইভাবে প্রতিবাদ দেখানো হয়েছিল। সেই পথই অনুসরণ করল বিএনপিও।

তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিও জানায় তাদের প্রতিবাদে। কমনওয়েলথ দেশের নেতাদের এবং বিশ^বাসীর সমর্থন আদায় করতে স্মারকলিপি প্রদানের পাশাপাশি বিএনপি অন্য যে কাজটা করে তাদের দৃষ্টিতে ইতিহাস সৃষ্টি করল, তা হলো দীর্ঘ চার মাইল তারা মিছিল করেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে তারা উত্তাপ ছড়িয়েছে, কণ্ঠ থেকে বেরিয়েছে অশালীন উক্তি। মারমুখী একটা জঙ্গিত্ব ছিল তখন কর্মীদের মাঝে। এই মারমুখো অবস্থাকে জানান দিয়েই বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রীকে তারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, গোটা বাংলাদেশের জন্য এ মিছিল কিংবা মন্ত্রীকে শারীরিক আক্রমণ কোনো আনন্দের সংবাদ নয়, এ মিছিল কিংবা আক্রমণ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনুজ্জ্বল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কারণ ব্রিটেনের রাস্তায় বাংলাদেশের কায়দায় মিছিল করে কিংবা মন্ত্রীকে গলা ধাক্কা দিয়ে ‘গুম-হত্যা কিংবা মানবাধিকার’ লঙ্ঘনের অপপ্রচার সারা বাংলাদেশটাকেই হেয় করা হয়েছে বহুজাতির আবাস এই লন্ডন শহরটাতে।

৩) এদিকে প্রধানমন্ত্রী ১৭ এপ্রিল ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট স্টরি : পলিসি প্রগেসেজ এন্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু এই সেমিনারে তারেক জিয়ার প্রসঙ্গটা টেনে না আনলেই কি ভালো হতো না? কারণ খুব জোরালোভাবেই প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার করেছেন যে, তারেক জিয়াকে তিনি ফিরিয়ে নেবেন এবং বিচারের মুখোমুখি করবেন। তারেক জিয়ার এখানে অবস্থান নিয়ে ব্রিটেনের সরকারের সমালোচনাও করেছেন তিনি, অথচ তিনি আবার বলেছেন তারেক জিয়াকে যেভাবেই হোক দেশে ফিরিয়ে নেবেন। কিন্তু কাজটা আদৌ কি এত সহজ? যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মইনউদ্দিনকে নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে ব্রিটেনের বাঙালিরাও জোর দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে, কিন্তু ব্রিটেনের প্রণিত আইন তার মতোই চলে। সেখানে সরকারেরও নাক গলানোর কোনো অবকাশ নেই। চৌধুরী মইনউদ্দিনের জন্য যেমন ব্রিটিশ সরকারের মাথাব্যথা নেই, সেখানে তারেক জিয়া নিয়ে কি কোনো নতুন পথ দেখতে চাইবে ব্রিটিশ সরকার। নিশ্চয়ই না। তা ছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ইতোমধ্যে বলেছেন যে, তারেক জিয়া বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাইকমিশনে জমা দিয়ে নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। যদি তা সঠিক হয়, তাহলে তারেক জিয়াকে বাংলাদেশে আদালতে তোলা কিংবা বিচারের সম্মুখীন করা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সে প্রশ্নও থেকে যায়। সে জন্যই বলি, তারেক জিয়ার ইস্যুকে সামনে এনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তারেক জিয়াকে কি গুরুত্বপূর্ণ করে ফেললেন না?

এত কিছুর মধ্য দিয়েও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সফর শেষ করেছেন তার সরকারের সাফল্য দিয়েই। দেখা করেছেন তিনি ব্রিটেনের রানীর সঙ্গে। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের একটা উর্বর ভ‚মি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, বিদেশি ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে তিনি চেষ্টা করেছেন।
৪) লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে এ বাঙালি কমিউনিটিতে যদি আমরা হিসাব মিলাই, তাহলে দেখা যায়, বিএনপি কিন্তু এখানে অনেক ক্ষেত্রেই সফল। কারণ সরকারের সফলতার কথা বিশ্বের গণমাধ্যমে প্রচার করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট পদস্থরা ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি এখানে সফল হয়েছে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায়। যেভাবেই হোক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিএনপি-জামায়াত সফল। দূতাবাস থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ কিংবা বাংলাদেশ সরকারের সুবিধাভোগী অংশ এই ব্রিটেনে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা করতে যতটুকু সফলতা দেখাচ্ছেন, তারচেয়ে বরং সফল বিএনপি কিংবা জামায়াতী গ্রুপ। কারণ সরকারের সুবিধাভোগীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতীরা সরকারবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশের ইমেজকে হেয় করতে পেরে এখানে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। স্বাভাবিকভাবেই জাতি হিসেবে তাদের এই অপপ্রচার আমাদের জন্য লজ্জার।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

148 total views, 1 views today

মন্তব্য করুন।

Please enter your comment!
Please enter your name here