সাঁতার-প্রিয় শুভকে সাঁতারই টেনে নিয়েছে পরপারে

মোঃ মহসিন হোসাইনঃ

ড.জালাল আলমগীর শুভ’র ভ্রমণ আর অভিযানের প্রচণ্ড নেশা ছিল। পাহাড় ডিঙানো আর সাগরে সাঁতার কাটতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। আর সেই শখই কাল হয়ে দাঁড়ালো তরুণ গবেষক ড. জালাল আলমগীর শুভ’র জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির এই তরুণ অধ্যাপক এক বছরের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন রাজনীতি আর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গবেষণা করার জন্য। কাজ আর কাজে হাঁপিয়ে ওঠায় স্ত্রী ফাজিলা মোর্শেদকে নিয়ে থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন একটু অবকাশ/সময় কাটানোর জন্য। সঙ্গে ছিল তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্পট ব্যাংকক থেকে এক ঘণ্টা দূরত্বের ফুকেটের সাউথ কোস্ট এলাকা। শনিবার (৩ ডিসেম্বর-২০১১ইং) সেখানেই সমুদ্রে সাঁতার কাঁটার নেশা পেয়ে বসে শুভকে। পর্যটকদের সাঁতারের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাই আছে সেখানে। ডুব সাঁতার আর উপুড় সাঁতার। অভিযান প্রিয় শুভ বেছে নিলেন উপুড় হয়ে সাঁতার কাঁটাকেই। সঙ্গীরা থাকলো কূলে। উপুড় হয়ে সামুদ্রিক উদ্ভিদ আর প্রাণীকূলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে শুভ কূল থেকে দূরে চলে যান তা টেরই পাননি। সমুদ্রের তলদেশের রহস্য খোঁজার নেশায় মত্ত শুভ যখন বুঝতে পারলেন তার অক্সিজেন মাস্ক বিকল হয়ে গেছে, অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে আসছে, তখন তার আশপাশে কেউ নেই। এমনকি সৈকতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরাও তার থেকে অনেক দূরে। মৃত্যুর মুখোমুখি শুভর হাত ছোড়াছুড়ি দেখে সবাই ছুটে গিয়ে তীরে এনে তার স্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে। কিন্তু চিকিৎসকরা জানালেন সাঁতার-প্রিয় শুভকে সাঁতারই টেনে নিয়েছে পরপারে।

আড্ডাপ্রিয় আর বন্ধুবৎসল শুভ ছিলেন অসম্ভব মেধাবী।তাঁর পিতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। কিন্তু জালাল পিতৃপরিচয়ের বাইরেও নিজের একটি পরিচয় গড়ে তোলেন অল্প বয়সেই। গবেষণায় অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনেক বই। দেশে গবেষণার সময় পরিকল্পনা করেছিলেন আরও একটি বই লেখার। দেশের রাজনীতি আর কূটনীতি নিয়ে গবেষণার টানে বোস্টন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপকের পদ থেকে এক বছরের বিশেষ শিক্ষা ছুটি নিয়ে ছুটে আসেন তাঁর খুবই আপন নিজ মাতৃ দেশে। এসেই এক বছরের জন্য যুক্ত হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে। লক্ষ্য একটাই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার তুলনামূলক গবেষণা। স্বাধীনতার চার দশকে বাংলাদেশ?- এ বিষয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে।

২০১১ সালের ২৬ থেকে ২৮শে নভেম্বর এ আন্তর্জাতিক এই সেমিনারের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ২৬শে নভেম্বর সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান শেষে অবকাশ যাপনের জন্য বলেছিলেন সহধর্মিণী ফাজিলা মোর্শেদকে। কোথায় যাওয়া যায়। পরিকল্পনা আঁটেন কাছাকাছি থাইল্যান্ড যাবেন। হরতাল, শুক্র, শনি ছুটি। সহধর্মিণী ছাড়া সঙ্গী ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু। ২০১১ সালের ২রা ডিসেম্বর থাই এয়ারওয়েজে ব্যাংকক যান তাঁরা। সেখান থেকেই শনিবার দুপুরে শুভর মৃত্যুর খবর আসে দেশে। ২০১১ সালের ৪ঠা জানুয়ারি একই সঙ্গে দুই ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল। বিয়ের আকদ হয় তিন বছর আগে। স্ত্রী ফাজিলা মোর্শেদ সাবেক রাষ্ট্রদূত কায়সার মোর্শেদের মেয়ে।

জালাল আলমগীরের কাজের ব্যাপ্তি ও গভীরতার পরিচয় মেলে উইকিপিডিয়ায় গেলেই। তার নামে সার্চ দিলেই বেরিয়ে আসে বিপুল কাজের ফর্দ। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী জালাল খুব অল্প সময়েই নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার একজন বিশিষ্ট গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশ্বায়ন এবং প্রতিনিধিত্বশীল রাজনীতির বিশেষজ্ঞ জালাল ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাউথ এশিয়া ইনিশিয়েটিভের ফেলো ছাড়াও তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সাউদার্ন এশিয়ান ইনস্টিটিউট এবং নয়া দিল্লিতে সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চে গবেষণায় নিয়োগ পেয়েছিলেন। এছাড়া জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল এবং বিভিন্ন সংস্থাকে পরামর্শ দিয়েছেন। বেশ কিছু গবেষণামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সে সবের মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে রাজনৈতিক সুবিচার, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিনিধিত্বের মূল্যায়ন এবং মিয়ানমারে কর্তৃত্বপরায়ন ও বৈশ্বিকীকরণ অন্যতম। তিনি রেড ব্রিজ স্ট্রাটেজিতে প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ড. জালাল আলমগীরের প্রথম বইয়ের প্রকাশক ছিল রাটলেজ। বইয়ের বিষয় ছিল ভারত। শিরোনাম ইনডিয়াস ওপেন ইকোনমি পলিসি: গ্লোবালইজম, রাইভেলারি, কনটিনিউটি। বিশ্বায়ন এবং পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের উপর তার প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধানমূলক বই এটি। প্রথম বইয়েই তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন অনুসন্ধিৎসু পাঠক মহলের। ২০০৮ সালে পলিসি মেকার লাইব্রেরিতে এশিয়া পলিসি অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া এ বইটি এসোসিয়েশন ফর এশিয়ান স্টাডিজ আনন্দ কেন্তিশ কুমারাস্বামী বুক প্রাইজের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল। ড. আলমগীরের উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে- ১. ১৯৭১ জেনোসাইড: ওয়ার ক্রাইমস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ক্রাইমস? ২. বাংলাদেশ ফ্রেশ স্টার্ট। এছাড়াও তার অন্যান্য রচনা ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ রিভিউ, এশিয়ান সার্ভে, এশিয়ান স্টাডিজ রিভিউ, ইসুজ অ্যান্ড স্টাডিজ, প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্স, ব্রাউন ইকোনমিক রিভিউ, দ্যা জার্নাল অব কনটেমপোরারি এশিয়া, দ্যা জার্নাল অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, দ্যা জার্নাল অব সোস্যাল স্টাডিজ, এনসাইক্লোপেডিয়া অব গ্লোবালাইজেশন ইন দ্যা গ্লোবাল ইকোনমি এবং গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড পলিটিকস ইন ইন্ডিয়ায় গৃহীত হয়েছে।

এছাড়া তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফরেন পলিসি, কারেন্ট হিস্ট্রি, দ্যা নেশন, চায়না ডেইলি, ওপেন ডেমোক্রেসি, গ্লোবাল পোস্ট, দ্যা ডেইলি, স্টার ফোরাম, কাটামারান: জার্নাল অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান রাইটিং এবং দ্য হাফিংটন পোস্ট অন্যতম। তার বহু মন্তব্য ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য বোস্টন গ্লোব এবং ডব্লিউবিএআই রেডিও, এনইইএন, ডয়েচে ভেলে রেডিও ও ভয়েস অব আমেরিকায়।

ড. জালাল ছিলেন বাংলাদেশীদের বিশ্বব্যাপী সংগঠন দৃষ্টিপাতের একজন সদস্য। তিনি দৃষ্টিপাত রাইটার্স কালেকটিভ-এ অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে তার পিতা মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপিকে সাবেক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আটক করার তীব্র প্রতিবাদ ও প্রচারণা চালিয়েছিলেন তিনি। জালাল আলমগীর তার গবেষণাকে কেবল প্রচলিত একাডেমিক প্রকাশনার জগতে সীমিত রাখেননি। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশ নিয়ে যারা গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাছে গত কয়েক বছরে জালাল আলমগীর একটি পরিচিত নাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, এশিয়ান স্টাডিজ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় গবেষণা জার্নালে জালাল যেসব প্রকাশ করেছে তার গবেষণার ফলাফল, তেমনি নিয়মিতভাবে লিখেছে হাফিংটন পোস্টে, ওপেন ডেমোক্রেসির মতো ইন্টারনেটভিত্তিক ম্যাগাজিনে। জালাল আলমগীরের মৃত্যুতে টকেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওইম্যান স্টাডিজের ডিরেক্টর এবং বিশিষ্ট দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আয়েশা জালাল লিখেছেন, হি উইল বি ডিয়ারলি মিসড ইন দি ফিল্ড অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ।

লেখক পরিচিতিঃ

মোঃ মহসিন হোসাইন
কবি, লেখক, কলামিষ্ট ও সাংবাদিক
সাংগঠনিক সম্পাদকঃ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ ও নির্যাতন প্রতিরোধ সোসাইটি, কেন্দ্রীয় কমিটি।
সাংগঠনিক সম্পাদকঃ স্বপ্নীলকন্ঠ সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ,কচুয়া উপজেলা শাখা,চাঁদপুর।

34 total views, 1 views today