শিক্ষা ও শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর পথে এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ

—-ইঞ্জিনিয়ার মোঃ জসীম উদ্দিন—-

আজ ২০১৯ সনের ১৭ মার্চ আমাদের জাতির জনকের একশত তম জন্মদিন । ১৯২০ সনের এ দিনে বিশ্ব বরেণ্য রাজনীতিবিদ,বাঙ্গালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার এক অজো গাঁ টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন । বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল বলে টুঙ্গিপাড়া আজ এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে’ বিখ্যাত গ্রাম । বাঙ্গালীর তীর্থ স্থান । জাতির স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নামের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে টুঙ্গিপাড়া নামের গ্রামটি ও জড়িয়ে আছে ।
বাঙ্গালি এক অতি পরম সৌভাগ্যবান জাতি । তাদের কিছু কীর্তি ও অর্জন আছে যা বিশ্বে অনেকের নেই । মাতৃভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য দুনিয়ার বুকে ক’টা জাতির আছে? এরচে’ বড় কথা – আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবের মত এত বড় মাপের নেতা পৃথিবীর কোন দেশের বা জাতির আছে ?
বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশেষত্ব এই যে, তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পরিক্রমায় পরিপক্ষতা অর্জন করে তবেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন ।পাকিস্তান আমলে তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারে হক মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রি ছিলেন । তখন তার কী-ই বা আর বয়স ? মাত্র চৌত্রিশ বছর । বঙ্গবন্ধুর মত দ্বিতীয় আরেক ক্যারিশমেটিক নেতা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে খুঁজে বের করা কঠিন । তার এক সম্মোহনী শক্তি এবং অনন্য বাগ্মীতা তাকে অন্যদের চেয়ে পৃথক করে রেখেছে । ১৯৭১ সনের সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছিল । এই একটিমাত্র ভাষণ বাঙ্গালি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ঘর ছেড়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পাগল করে তুলে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের বিশালতা প্রসঙ্গে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মহান বিপ্লবী নেতা প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেন – ‘I have not seen the Himalays.But I have seen Sheikh Mujib. In personality & in courage,this man is the Himalays. I have thus had the experience of witnessing the Himalays’. ( আমি হিমালয় দেখিনি , তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি । ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান । এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম । )
ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মত বিশ্ব মাপের নেতার বিশ্লেষনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বিশালতা সমসাময়িক বিশ্ব নেতাদের এভাবেই ছাড়িয়ে যায় । আসলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে উপমহাদেশের ক’জন বরেণ্য রাজনীতিবিদের অবদান কোনমতে কম নয় । এরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক , নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ । তারা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু ও সহকর্মি ছিলেন । তাদের কাছে রাজনীতির দীক্ষা নিয়ে মুজিব বহুদুর এগিয়ে গেছেন । আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যখন তার দলের সেক্রেটারী শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেন , ‘মজিবরের মত সেক্রেটারী আমি আর জীবনে পামু না ‘- তখন আমরা টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের মধ্যে জাতির দুর্দিনের কাণ্ডারী শেখ মুজিবকে আবিস্কার করি ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করা সাধারণের পক্ষে কঠিন । তাকে নিয়ে কত গুণীজনে লিখেছেন । গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেছেন দেশ বিদেশের কত খ্যাতিমান ব্যক্তি । তিনি নিজে ও তার জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন তার আত্মজীবনীতে । সেটি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নামে তার মৃত্যুর বহু পরে প্রকাশিত হয়েছে । এ সব ঘেটে ঘেটে আমরা শেখ মুজিবকে আপাদমস্তক জেনে নেবার চেষ্ঠা করতে পারি ।
১৯৭২ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন
শেখ মুজিব । দেশে ফিরে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সর্বাগ্রে নজর দেন । প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার জন্য ‘কুদরাত-ই-খুদা’ শিক্ষা কমিশন গঠন করেন । এ কমিশনের রিপোর্ট আদ্যেপান্ত পাঠ করে যে কেউ বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনটি সহজে অনুধাবন করতে পারে । সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদের ন্যায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন তাতে ঘটেছে। তিনি বাঙ্গালী জাতিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন । দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত বর্ণবাদ বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা শিক্ষাকে যেভাবে মনে করেন -‘Education is the most powerful weapon that we can use to change the world’.
আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিব প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেন । সবার জন্য এ স্তরের শিক্ষা বাধ্যতামুলক ও সার্বজনীন করে দেন । শিক্ষকদের জীবন-মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তাদের চাকুরী জাতীয়করণ করেন । পরবর্তী পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তর নিয়ে ও তার সে ভাবনাই ছিল ।
দুর্ভাগ্য আমাদের । বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন আর এগুতে পারেনি । তার সে স্বপ্নগুলো ৭৫’র ১৫ আগষ্ট স্তব্ধ হয়ে যায় । সেখানেই আটকে পড়ে বাংলাদেশ ।
বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন রাহুমুক্ত । জাতির জনকের কন্যা আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় । এ আমাদের আরেক সৌভাগ্য । বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে । শিক্ষা ও শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর পথে এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ । কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আলোকে পরিচালিত হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা । বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণের দাবীটি আবারো জানিয়ে দেই আমাদের জনকের শুভ জন্মদিনে ।

লেখক পরিচিতিঃ
বিশিষ্ট কলামিস্ট,গবেষক ও রাজনৈতিকবিদ

64 total views, 1 views today