ইফতার শুধু পেটের ক্ষুধা নিবারণ নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত ॥॥॥ — মোঃ মহসিন হোসাইন —

ইফতার রোজার অন্যতম অনুষঙ্গ। এর মাধ্যমে রোজা পূর্ণ হয়। ইফতার শুধু পেটের ক্ষুধা নিবারণ নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদতও। আল্লাহ মুমিনদের পুরস্কারের জন্য ইফতারের মুহূর্তটি নির্ধারণ করেছেন। নানা ধরনের খাবার সামনে পড়ে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর বিধান না থাকায় খাচ্ছে না-এটা আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দের। এর মাধ্যমে তাকওয়া বা খোদাভীতির প্রকাশ ঘটে। রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের খুশির মুহূর্ত দুটি: এক. ইফতারের মুহূর্ত, দুই. তাকে যেদিন জান্নাতে স্বাগত জানানো হবে। বান্দা যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসে থাকে, আল্লাহ তখন ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। ইফতারের সময় দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে।

ইফতারের কোনো দোয়া সাধারণত বৃথা যায় না। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় দশ লাখ লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ অন্য হাদিসে আছে ‘ইফতারের সময় কোনো দোয়া বাতিল করা হয় না। এ সময়ের দোয়া খুব তাড়াতাড়ি কবুল হয়।’ ইফতারের সময় এই দোয়াটি পড়ার কথা হাদিসে আছে: ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোজা রেখেছিলাম এবং তোমার রিজিক দ্বারাই ইফতার করলাম।’

রোজাদারকে ইফতার করানোর মধ্যেও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যিনি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবেন, তা তার অপরাধ ক্ষমা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে। তিনি রোজাদারের সম পরিমান সওয়াব পাবেন।’ (বুখারি) তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে সামান্যও কমানো হবে না। আমরা কাউকে ইফতার করানো বলতে বুঝি ভরপেট খাওয়ানো। সওয়াব পাওয়ার জন্য এটা জরুরি নয়। সামান্য খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করালেও পুরো সওয়াব পেয়ে যাবে।

সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করে নেয়া সুন্নত। অযথা ইফতারে দেরি করতে নেই। তবে সূর্যাস্তের বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। কেউ যদি সময় হয়ে গেছে মনে করে সময়ের আগেই খেয়ে ফেলে তার রোজা ভেঙে যাবে। তাকে এই রোজার কাজা করতে হবে। ইফতারের মুহূর্তে অযথা গল্প-গুজবে লিপ্ত না হওয়াই ভালো। এ সময় মনে মনে জিকির ও তওবা করা উচিত। অনেকে এক সঙ্গে ইফতার করলে সম্মিলিতভাবে দোয়াও করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে ইফতার পার্টির নামে রাজনৈতিক যে কালচার প্রচলিত সেখানে ইফতারের আগমুহূর্তে অন্যের সমালোচনা ও কুৎসায় ভরপুর থাকে। এজন্য দ্বীনের জন্য এসব অনুষ্ঠান কল্যাণকর নয়। ইফতার একটি ইবাদত, এটাকে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী পালন করাই বাঞ্চনীয়। রাজনৈতিক ব্যানারেও ইফতারের আয়োজন হতে পারে। তবে সেখানে যথাসম্ভব পরচর্চা ও গিবত থেকে বেঁচে থাকা উচিত।

ইফতারকেন্দ্রিক অপচয় এখন আমাদের সমাজে মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপচয় কোনো ক্ষেত্রেই ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামে অপচয়কারীকে ‘শয়তানের ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, রোজাদার যত খুশি খেতে পারবেন, এর কোনো জবাবদিহিতা নেই। এটা মূলত ঠিক নয়। অতিরিক্ত খাবারকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে। এর কারণে ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে। সংযমের জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতেই সিয়াম সাধনা। সারা দিন রোজায় সংযম অবলম্বন করার পর ইফতারের মুহূর্তে অসংযমী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইফতার যতটুকু প্রয়োজন এতটুকুই করতে হবে। প্রয়োজনের বেশি করলে তা অপচয় হবেই।

বিভিন্ন ইফতার আয়োজনে অপচয়টা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। অথচ আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ ইফতারের জন্য তেমন কিছুই পায় না। সামান্য খেয়ে বা না খেয়ে রোজা রাখে এমন মানুষের সংখ্যা প্রচুর। রমজানে অসহায়-দুঃস্থ মানুষগুলোর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো সবার ইমানি দায়িত্ব। আপনি পর্যাপ্ত খেলেন কিন্তু আপনার প্রতিবেশী একজন না খেয়ে বা সামান্য খেয়ে রোজা রাখছে তার প্রতি খেয়াল রাখা আপনার সামাজিক দায়িত্বও বটে। পবিত্র রমজানে ইমানি ও সামাজিক এই দায়িত্ববোধ আরও বেশি করে জাগ্রত করা জরুরি। কোনো কারণে ইফতার অতিরিক্ত হয়ে গেলে তা নষ্ট না করে গরিব-দুঃস্থদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়াই উত্তম।

লেখক পরিচিতিঃ
কবি, লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
কেন্দ্রীয় সহ-সাধারন সম্পাদকঃ বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।
সহ- সম্পাদকঃ ফোকাস মোহনা।
বিভাগীয় সম্পাদকঃ সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ

134 total views, 2 views today