আরবি, বাংলা, ইংরেজি মাস ও দিনের নামকরণ ॥॥॥— মোঃ মহসিন হোসাইন —

 

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে নিমজ্জিত রেখেছেন, যেন তারা স্মরণ করে তার প্রভুকে। তাঁর অন্যতম নিয়ামত হলো, সময় তথা দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস, বছর গণনার জন্য তিনি চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন। উভয়ের মাধ্যমে সন-তারিখ ঠিক করার প্রথা বহুকাল ধরে প্রচলিত। উভয়ের মাধ্যমে সন-তারিখ নির্দিষ্ট করা জায়েজ। তবে চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর অধিকতর পছন্দনীয়। শরিয়তের আহকামের ক্ষেত্রে চন্দ্র মাসই নির্ভরযোগ্য। চন্দ্রমাসের হিসাব মতেই রোজা, হজ¦, যাকাত প্রভৃতি আদায় করতে হয়। চন্দ্রবছরের হিসাব সংরক্ষণ করা ফরজে কেফায়া। সব উম্মত এই হিসাব ভুলে গেলে সবাই গুনাহগার হবে। চাঁদের হিসাব ঠিক রেখে অন্যান্য বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা বৈধ।
আরবি মাসের নামকরণঃ
১. মহররম : জাহেলি যুগে এই মাসে কোনো ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত করা হারাম ও অবৈধ ছিল বলে এই মাসকে মুহর্রমুল হারাম নামকরণ করা হয়েছে। ২. সফর : সফর শব্দটি সিফর থেকে নির্গত। এর অর্থ শূন্য হওয়া, জাহেলি যুগে সফর মাসে লোকেরা যুদ্ধের জন্য বের হয়ে গেলে ঘর শূন্য হয়ে যেত, তাই সফরের মাসের নাম সফর রাখা হয়েছে। ৩. রবিউল আউয়াল : এই মাসের নামকরণকালে ফসলে রবি- অর্থাৎ বসন্তকাল ছিল, তাই তার নামকরণ হয়েছে রবিউল আউয়াল। ৪. রবিউস সানি : এর নামকরণকালে বসন্তের শেষার্ধে পড়ার কারণে রবিউল আখের বা শেষ বসন্ত নাম রাখা হয়। ৫. জুমাদাল উলা : জুমাদা শব্দটি এসেছে জুমুদ থেকে, যার অর্থ জমে যাওয়া, স্থবির হওয়া। যখন এই মাসের নাম রাখা হয় তখন ঠা-ার মৌসুম আরম্ভ হয়, কেননা ঠা-ার কারণে প্রায় জিনিস জমে যায়। এ জন্য এ মাসের নাম এভাবে রাখা হয়। ৬. জুমাদাল উখরা : এই মাসের নাম রাখার কারণ হচ্ছে, এই মাসের শেষে শীতের প্রচ-তায় পানি পর্যন্ত জমে যেত। ৭. রজব : রজব শব্দটি রজিব থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ হলো সম্মান করা। আরববাসী যেহেতু এ মাসকে সম্মান করত এবং শাহরুল্লাহ – অর্থাৎ আল্লাহর মাস বলত, তাই এ মাসের নাম রজব বা সম্মানিত মাস রাখা হয়। ৮. শাবান : শাবান শাব শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ হলো বের হওয়া, প্রকাশ হওয়া, বিদীর্ণ হওয়া। যেহেতু এ মাসে বিপুল কল্যাণ প্রকাশিত হয়, মানুষের রিজিক উৎপাদন ও বণ্টিত হয় এবং তকদিরের ফয়সালাগুলোও বণ্টন করে দেওয়া হয়। তাই এ মাসের নাম শাবান রাখা হয়েছে। ৯. রমজান : রমজান শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে জ্বালানো-পোড়নো। যেহেতু এই মাসে মুমিনের গুনাহগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়, তাই এ মাসের নাম রমজান রাখা হয়। ১০. শাওয়াল : শাওয়াল শব্দটি শাওল ধাতু থেকে নির্গত, অর্থ বাইরে গমন করা। এখানে আরববাসী নিজ ঘরবাড়ি ত্যাগ করে ভ্রমণে যেত। তাই এর নামকরণ করা হয় শাওয়াল। ১১. জিলকদ : ‘জিল’ অর্থ ওয়ালা আর ‘কাদাহ’ অর্থ বসা, যেহেতু এ মাস সম্মানিত মাসের একটি। আরবরা এ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকত। ১২. জিলহজ : জিলহজ শব্দটি সম্ভবত হাজ্জাহ থেকে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ একবার হজ করা, অথবা শব্দটি হিজ থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ বছর। যেহেতু এই মাস বছরের শেষাংশে আসে এবং এর দ্বারাই পূর্ণ বছরের সমাপ্তি ঘটে, তাই এই মাসের নামকরণ করা হলো জিলহজ।
বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণঃ
১. বৈশাখ- বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ২. জ্যৈষ্ঠ- জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৩. আষাঢ়- উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৪. শ্রাবণ- শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৫. ভাদ্র- উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৬. আশ্রিন- অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৭. কার্তিক- কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৮. অগ্রহায়ণ(মার্গশীর্ষ)- মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ৯. পৌষ- পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ১০. মাঘ- মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ১১. ফাল্গুন- উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ১২. চৈত্র- চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে।
বাংলা দিনের নামকরণ
১. সোমবার হচ্ছে সোম বা শিব দেবতার নাম অনুসারে, ২. মঙ্গলবার হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে, ৩. বুধবার হচ্ছে বুধ গ্রহের নাম অনুসা, ৪. বৃহস্পতিবার হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের নাম অনুসারে, ৫. শুক্রবার হচ্ছে শুক্র গ্রহের নাম অনুসারে, ৬. শনিবার হচ্ছে শনি গ্রহের নাম অনুসারে, ৭. রবিবার হচ্ছে রবি বা সূর্য দেবতার নাম অনুসারে।
ইংরেজী মাসের নামকরণ
১. জানুয়ারি : রোমে ‘জানুস’ নামক এক দেবতা ছিল। রোমবাসী তাকে সূচনার দেবতা বলে মানত। যে কোন কিছু করার আগে তারা এ দেবতার নাম স্মরণ করত। তাই বছরের প্রথম নামটিও তার নামে রাখা হয়েছে। ২. ফেব্রুয়ারি : রোমান দেবতা ‘ফেব্রুস’-এর নাম অনুসারে ফেব্রুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয়েছে। ৩. মার্চ : রোমান যুদ্ধ-দেবতা ‘মরিস’ এর নামানুসারে তারা মার্চ মাসের নামকরণ করেন। ৪. এপ্রিল : বসন্তের দ্বার খুলে দেয়াই এপ্রিলের কাজ। তাই কেউ কেউ ধারণা করেন ল্যাটিন শব্দ ‘এপিরিবি’ (যার অর্থ খুলে দেয়া) হতে এপ্রিল এসেছে। ৫. মে : রোমানদের আলোকে দেবী ‘মেইয়ার’-এর নামানুসারে মাসটির নাম রাখা হয় মে। ৬. জুন: রোমানদের নারী, চাঁদ ও শিকারের দেবী ছিলেন ‘জুনো’। তার নামেই জুনের সৃষ্টি। ৭. জুলাই : জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে বছরের প্রথমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে স্থান দিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে দূরে সরিয়ে দেন। ৮. আগস্ট : জুলিয়াস সিজার বছরকে ঢেলে সাজানোর পর আগস্ট মাসটি তার নিজের নামে রাখার জন্য সিনেটকে নির্দেশ দেন। সেই থেকে শুরু হয় আগস্ট মাসের পথচলা। ৯. সেপ্টেম্বর : সেপ্টেম্বর শব্দের শাব্দিক অর্থ সপ্তম মাস। কিন্তু সিজার বর্ষ পরিবর্তনের পর তা এসে দাঁড়ায় নবম মাসে। তারপর এটা কেউ পরিবর্তন করেনি। ১০. অক্টোবর : ‘অক্টোবরের’ শাব্দিক অর্থ বছরের অষ্টম মাস। সেই অষ্টম মাস আমাদের ক্যালেন্ডারের এখন স্থান পেয়েছে দশম মাসে। ১১. নবেম্বর : ‘নভেম’ শব্দের অর্থ নয়। সেই অর্থানুযায়ী তখন নবেম্বর ছিল নবম মাস। জুলিয়াস সিজারের কারণে আজ নবেম্বরের স্থান এগারতে। ১২. ডিসেম্বর : ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম’ অর্থ দশম। সিজারের বর্ষ পরিবর্তনের আগে অর্থানুযায়ী এটি ছিল দশম মাস। কিন্তু আজ আমাদের কাছে এ মাসের অবস্থান ক্যালেন্ডারের শেষ প্রান্তে।
ইংরেজি ৭ দিনের নামঃ
১. শনিবার : রোমান সাম্রাজ্যের আমলের লোকেরা এই বলে বিশ্বাস করত যে, চাষাবাদের জন্য ‘স্যাটান; নামের একজন দেবতা আছেন। যার হাতে আবহাওয়া ভালো খারাপ করা লেখাটি আছে। তাই তাকে সম্মান করার জন্যই তার নামে একটি গ্রহের সাথে সপ্তাহের একটি দিনের নাম স্যাটনি ডেইজ রাখা হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে স্যাটানের দিন। বর্তমানে তা ‘স্যাটারডে’ নামেই পরিচিত। ২. রবিবার : অনেকদিন আগের কথা, দক্ষিণ ইউরোপের সাধারণ ‘লোকেরা বিশ্বাস করত এবং ভাবত যে একজন দেবতা রয়েছেন যিনি শুধুমাত্র আকাশে গোলাকার আলোর বল অংকন করেন। ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় ‘সলিছ’। এর থেকেই সলিছ ডে অর্থাৎ সূর্যের দিন। উত্তর ইউরোপের লোকেরা এই দেবতাকে ডাকত ‘স্যানেল ডেইজ’ নামে। যা পরবর্তীতে বর্তমান সান ডে-তে রূপান্তরিত হয়। ৩. সোমবার : এই নামের সাথেও দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা জড়িত। রাতের বেলায় আকাশের গায়ে রূপালী বল দেখে তারা ডাকত ‘লুনা’ নামে। ল্যাটিন শব্দ লুনা ডেইস। উত্তর ইউরোপের লোকেরা ডাকত মোনান ডেইজ। এ মানডে কিন্তু মোনান ডেজ থেকে রূপান্তর হয়। ৪. মঙ্গলবার : আগেকার রোমান রাজ্যের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, টিউ নামক একজন দেবতা আছেন যিনি যুদ্ধ দেখাশুনা করেন। তারা ভাবত যারা টিউকে আশা করত টিউ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত যুদ্ধের ময়দানে এবং যারা পরলোক গমন করেছে তাদেরকে টিউ পাহাড় থেকে নেমে একদল মহিলা কর্মী নিয়ে বিশ্রামের জায়গা ঠিক করত। তারা একে ডাকত ‘ডুইস’ নামে। যার ইংরেজি অর্থ টুইস ডে। ৫. বুধবার : দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘উডেন’ বলে দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা ভাবত। তিনি সারা দিন ঘুরে জ্ঞান লাভ করতেন যার জন্য তার একটি চোখ হারাতে হয়েছিল। এই হারানো চোখকে তিনি সবসময় লম্বাটুপি দিয়ে আবৃত করে রাখতেন। দুটো পাখি উডেনের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করত, তারা উডেনের কাঁধে বসে থাকত। রাতে তারা সারা পৃথিবীর ঘটনাবলি উডেনকে শুনাত। এভাবেই উডেন সারা পৃথিবীর খবর শুনতে সক্ষম হন। এজন্য লোকেরা নাম রাখল ওয়েডনেস ডেইস। যা বর্তমান ওয়েডনেস ডে নামে পরিচিত। ৬. বৃহস্পতিবার : বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর সম্পর্ক না জানার ফলে মানুষ মনে করত যে, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর জন্য একজন দেবতা দায়ী। তারা শুধু আলো জ্বলতে ও বিদ্যুৎ চমকাতে দেখত। তারা দেবতার নাম রাখে থর। তাদের মধ্যে এই অন্ধ বিশ্বাস ছিল যে, দেবতা থর যখন রাগান্বিত হন তখন তিনি রাগে আকাশে একটা হাতুড়ি নিক্ষেপ করেন দু’টি ছাগলের গাড়িতে বসে। ছাগলের গাড়ি চাকার শব্দ হচ্ছে বজ্রপাত ও হাতুড়ির আঘাত হচ্ছে বিদ্যুৎ চমকানো। থরের প্রতি সম্মান রক্ষার্থে তারা সপ্তাহের একটি দিনের নাম রাখেন থার্স ডেইস। যাকে আজ আমরা থার্স ডে বা বৃহস্পতিবার বলে ডাকি। ৭. শুক্রবার : ওডিন একজন শক্তিশালী দেবতা। তার স্ত্রী দেবী ফ্রিগ ছিলেন ভদ্র এবং সুন্দরী। ওডিনের পাশে সব সময় তার স্ত্রী থাকতেন। পৃথিবীকে দেখতেন, প্রকৃতিকে উপভোগ করতেন, প্রকৃতির দেবী ভালোবাসা ও বিবাহের দেবীও ছিলেন ফ্রিগ। এই জন্য লোকেরা বাকি একটি দিনের নাম ‘ফ্রিগ ডেইজ’ বা ফ্রাইডে রাখেন।

লেখক পরিচিতিঃ
কবি, লেখক ও সাংবাদিক
কেন্দ্রীয় সহ-সাধারন সম্পাদকঃ বাংলাদেশ তৃনমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।
বিভাগীয় সহ-সম্পাদকঃ সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ্
সহ-সম্পাদকঃ ফোকাস মোহনা।

121 total views, 1 views today