চাঁদপুর কচুয়ায় মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ ভাগ লোক আর্সেনিকযুক্ত অনিরাপদ পানি পান করছেন!

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন:দীর্ঘ একুশ বছর পূর্বে কচুয়া উপজেলা দেশের অন্যতম অতি আর্সেনিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও আজও বেশিরভাগ লোক আর্সেনিকযুক্ত (অনিরাপদ) পানি পান করে আসছে। জেনে শুনেই করছে মানুষ বিষ পান। আর্সেনিক ঝুঁকি এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পর ওই সময় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৭শ’ থেকে ৭৪০ ফুটের ২৫২টি আর্সেনিক মুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। গ্রীষ্মকালে পানির স্তর ৩০ ফুটের নিচে নেমে যায় বলে তখন ওই নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। ফলে দিন দিন মানুষ এসব নলকূপ ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে এসব নলকূপের অধিকাংশই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পরে ২০০০ সাল থেকে শতভাগ আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয় ‘তারা গভীর নলকূপ’। কিন্তু এ নলকূপ থেকে পানি তুলতে কমপক্ষে ১৫/১৬ বার সজোরে হাতল চাপতে হয়। এ কারণে ‘তারা নলকূপ’ ব্যবহার করতেও মানুষ আগ্রহবোধ করে না। অনেকেই ‘তারা নলকূপ’ থাকা সত্ত্বেও পানি উত্তোলনের জটিলতার কারণে সেগুলোর পানি ব্যবহার না করে মোটর সংযোগ করে সেচ কার্য কিংবা অন্যান্য কার্যে ব্যবহার করছে।

২০০০ সালে এনজিও গ্রামীণ শিক্ষা আর্সেনিক নিয়ে উপজেলার ২৪৩টি গ্রামে জরিপ চালায়। জরিপ মোতাবেক পরীক্ষিত টিউবওয়েলের সংখ্যা ১৭ হাজার ৭শ’ ৮৭টি। এর মধ্যে শতকরা ৯৮ভাগ টিউবওয়েলের পানিই আর্সেনিকযুক্ত। এই টিউবওয়েলগুলোকে লাল রং দ্বারা এবং আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েলগুলোকে সবুজ রং দ্বারা চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে সেসব চিহ্নের কোনো অস্তিত্ব নেই।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ একটি প্রকল্পের আওতায় ২০১১ সালে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিরূপণে জরিপ কাজ চালায়। জরিপে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫১৩ জন শনাক্ত করা হয়। সে সময় রোগীদের রোগ উপশমে হাসপাতাল থেকে এন্টি অঙ্েিডন্ট ট্যাবলেট ও আয়রন পলিক এসিড জিং দেওয়া হতো। এখন আর ওইসব রোগী হাসপাতালে আসে না। তাই এই কার্যক্রম বন্ধ বলে ডাক্তাররা জানান।

সরেজমিনে গেলে জানা যায়, উপজেলার ১২নং ইউনিয়নের আশ্রাফপুর গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ গ্রামের শুধু চকিদার বাড়িতেই বর্তমানে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩০/৩২জন। ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ বাড়ির ৬জন লোক আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে বাড়ির লোকজন দাবি করেছেন। মৃত ব্যক্তিরা হচ্ছে ওই বাড়ির আবুল হাসেম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল লতিফ, আব্দুল মজিদ, আব্দুল হালিম ও শাহ আলম।

আর্সেনিকে আক্রান্ত চকিদার বাড়ির নুরুন্নাহার (৫৫), নাছিমা বেগম (৬০), সেলিম (৪২), পার্শ্ববর্তী কাজী বাড়ির ছালেহা বেগম (৫০), টোরা বাড়ির লুৎফুর রহমান (৫৫) ও যুগী বাড়ির সালেহা (৪৫) জানান, শীতকালে পায়ের জুতা খোলা যায় না। পায়ের তালুতে সাদা দাগে রক্ত জমাট হয়ে বিষ ফোঁড়ার মতো অবস্থা হয় ও চামড়া ফেটে যায়। গরমকালে তীব্র জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হয়। এবারের প্রচ- গরমে জ্বালাপোড়ার মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পেঁৗছেছে। তারা এ অসহনীয় জ্বালা যন্ত্রণার উপশমে কোনো ট্যাবলেট/ক্যাপসুল পাচ্ছে না। এই ইউনিয়নে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আরসিডিএস নিরাপদ সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তাদের পরিচালিত জরিপ অনুসারে এই ইউনিয়নে ৫ হাজার ৩শ’ ৭৪টি টিউবওয়েলের মধ্যে ৫ হাজার ৩০৬টিতেই আর্সেনিক পাওয়া যায়। আশ্রাফপুর ছাড়া এ উপজেলার শুয়ারুল, কাদলা, পনশাহী, মাসনিগাছা, গোবিন্দপুর, বিতারা ও চেলাকান্দা গ্রামে আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী রয়েছে বলে জানা যায়।

কচুয়া উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ জানান, ২০১১ সালের পরবর্তীতে কোনো জরিপ কাজ পরিচালিত না হওয়ায় বর্তমানে শনাক্তকৃত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও কতভাগ লোক নিরাপদ পানি পান করছে তার সঠিক তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জরিপ কাজটিও একটি জটিল প্রক্রিয়া। আর্সেনিকোসিস একটি মরণব্যাধি, এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে নিরাপদ পানি ব্যবহারে জনগোষ্ঠীকে অবিশ্যই সচেতন করে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে।

আর্সেনিক সংক্রান্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিকট কোনো জরিপ তথ্য না থাকলেও অনুমান নির্ভর তথ্য জানতে চাইলে চেয়ারম্যানদের দেয়া তথ্যানুসারে গড়ে কচুয়ার সোয়া ৪ লক্ষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৫-৪০ভাগ লোক নিরাপদ পানি পান করছে। পালাখাল মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন, পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ আজাদ ও গোহট উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল হাই মুন্সি তাদের ইউনিয়নবাসী গভীর নলকূপের স্বল্পতা ও সচেতনতার অভাবে অনূর্ধ্ব ৩০ ভাগ লোক মাত্র নিরাপদ পানি ব্যবহার করছে বলে দাবি করে অভিমত প্রকাশ করেন যে, চাহিদা মোতাবেক আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপনসহ গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সচেতনতার অভাবে আর্সেনিকে আক্রান্ত অনেক রোগীই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে ক্রমে ক্রমে মৃত্যুপথের যাত্রী হচ্ছে, তাছাড়া আক্রান্তের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী কামরুজ্জামান জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহে আর্সেনিক ঝুঁকি প্রকল্প থেকে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৬০৮টি গভীর নলকূপ স্থাপনের ইউনিয়নভিত্তিক বণ্টন তালিকা পাওয়া গেছে। তালিকা মোতাবেক টিওবওয়েল স্থাপন, আর্সেনিক স্ক্যানিংসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে এনজিও নিয়োগদানের কাজ শিগ্গিরই শুরু করা হবে। তিনিও আর্সেনিকের চরম পরিণতি বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন।

222 total views, 1 views today