ডেঙ্গু সচেতনতায় কিছু কথা !!!— ডাঃ আদল ইনসান — 

আমরা জানি ডেঙ্গু একটি সংক্রামক ট্রপিক্যাল ডিজিজ যা ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে হয়। সাধারণত  এডিস মশা কামড়ালে ৪-৬ দিনের মধ্যে এই রোগটি হয়। প্রধানত এডিস ইজিপ্টি নামক মশকি অর্থাৎ স্ত্রী মশা এই রোগের জন্য দায়ী।
ডেঙ্গু হলে আমরা কি ধরণের লক্ষ্মণ বা উপসর্গ পাবো??
সাধারণভাবে, ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্তরা হয় উপসর্গবিহীন (৮০%) অথবা সাধারণ জ্বরের মত সামান্য উপসর্গ। বাকিদের রোগ হয় আরো জটিল(৫%), এবং স্বল্প অনুপাতে এটি প্রাণঘাতী হয়। ইনকিউবিশন পিরিয়ডঃ (উপসর্গসমূহের সূত্রপাত থেকে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময়) স্থায়ী হয় ৩-১৪ দিন, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা হয় ৪-৭ দিন।  অতএব, আক্রান্ত এলাকা-ফেরত পর্যটকদের ডেঙ্গু হয় না যদি ঘরে ফেরার ১৪ দিনের বেশি পরে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ শুরু হয়। বাচ্চাদের প্রায়ই এই উপসর্গগুলি হয় যা সাধারণ সর্দি এবং গ্যাস্ট্রোএন্টারাটাইটিস (বমি ও ডায়েরিয়া)র সমান, আর সাধারণতঃ বড়দের চেয়ে উপসর্গের তীব্রতা কম হয়, কিন্তু রোগের জটিলতার শিকার বেশি পরিমাণে হয়।
ক্লিনিক্যালঃ
ডেঙ্গু উপসর্গের বৈশিষ্ট্য হ’ল হঠাত জ্বর হওয়া, মাথাব্যথা(সাধারণতঃ দু’চোখের মাঝে), মাংশপেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা, এবং র‍্যাশ বেরোনো। ডেঙ্গুর আরেক নাম “হাড়-ভাঙা জ্বর” যা এই মাংশপেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা থেকে এসেছে। মেরুদন্ড ও কোমরে ব্যাথা হওয়া এ রোগের বিশেষ লক্ষণ। সংক্রমণের কোর্স তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত: প্রাথমিক, প্রবল এবং আরোগ্য।
প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অত্যধিক জ্বর, জ্বরের মাত্রা প্রায়শ ১০৩ ° -১০৪ °ফারেনহাইট হয়, সঙ্গে থাকে সাধারণ ব্যথা ও মাথাব্যথা; এটি সাধারণতঃ দুই থেকে সাতদিন স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে ৫০-৮০% উপসর্গে র‍্যাশ বেরোয়। এটা উপসর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে লাল ফুসকুড়ি হিসাবে দেখা দেয়, অথবা পরে অসুখের মধ্যে ( ৪-৭ দিন) হামের মত র‍্যাশ দেখা দেয়। কিছু petechia (ছোট লাল বিন্দু যেগুলি ত্বকে চাপ দিলে অদৃশ্য হয় না, যেগুলির আবির্ভাব হয় ত্বকে চাপ দিলে এবং এর কারণ হচ্ছে ভগ্ন রক্তবাহী নালী) এই জায়গায় আবির্ভূত হতে পারে, এবং কারুর মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প রক্তপাতও হতে পারে।
কিছু লোকের ক্ষেত্রে অসুখটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যার কারণে প্রবল জ্বর হয় এবং সাধারণতঃ এক থেকে দুই দিন স্থায়ী হয়।  কখনো রক্তপ্রবাহে প্লেটলেট  এর পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তে তরলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ হ্রাস পায়। এই পর্যায়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকলতা এবং প্রবল রক্তপাত হয়, সাধারণতঃ গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ট্র্যাক্ট হতে পারে। ডেঙ্গুর সব ঘটনার ৫%-এরও কম ক্ষেত্রে শক (ডেঙ্গু শক সিনড্রোম) এবং হেমোরেজ (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার )ঘটে, তবে যাদের আগেই ডেঙ্গু ভাইরাসের অন্যান্য স্টিরিওটাইপ-এর সংক্রমণ ঘটেছে(“সেকেন্ডারি ইনফেকশন”) তারা বর্ধিত বিপদের মধ্যে রয়েছেন।
এরপর আরোগ্য পর্যায়ে বেরিয়ে যাওয়া তরল রক্তপ্রবাহে ফেরত আসে।  এটি সাধারণতঃ দুই থেকে তিনদিন স্থায়ী হয়। এই উন্নতি হয় চমকে দেবার মত, কিন্তু এতে প্রচন্ড চুলকানি এবং হৃদস্পন্দনের গতি ধীর হতে পারে।  আরেক রকম র‍্যাশও বেরোতে পারে ম্যাকুলোপাপুলার বা ভাস্কুলাইটিক রূপে, যার ফলে ত্বকে গুটি বেরোয়। এই পর্যায়ে তরলের অতিপ্রবাহ অবস্থা ঘটতে পারে। যদি এতে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয় তাহলে সচেতনতার মাত্রা হ্রাস অথবা মুর্ছা যাওয়া হতে পারে। এর পর এক ক্লান্তির অনুভূতি অনেক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
ডেঙ্গু নির্ণয়ের পরীক্ষাঃ
1. CBC
3.Dengue  NS1 antigen
ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসাঃ
ডেঙ্গু জ্বর হলে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে এবং বেশি করে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।  জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। প্রায়শ স্যালাইন দিতে হতে পারে। মারাত্মক রূপ ধারণ করলে রোগীকে রক্ত দিতে হতে পারে।  ডেঙ্গু জ্বরে হলে কোন ধরণের এন্টিবায়োটিক ও ননস্টেরয়েডাল প্রদাহপ্রশমী ওষুধ সেবন করা যাবে না।
অনেকসময় পেঁপের পাতার রস প্লেটলেট এর পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং রক্ত ক্ষরণ রোধ করে। ডাবের পানি,লেবুর শরবতও পান করা যেতে পারে।
পরামর্শঃ
১. বাসার আশেপাশে পরিষ্কার রাখতে হবে।
২. কোথাও জল জমে আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে।
৩. মশা নিধন করতে হবে।
৪. মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে।
৫. বিশেষ করে সকালে এবং সন্ধ্যার দিকে মশা যাতে না কামড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৬. ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং রোগীর অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
লেখক পরিচিতিঃ
ডাঃ আদল ইনসান
বি.ইউ.এম.এস ( ডি.ইউ)
মেডিকেল অফিসার, শেড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
মেডিকেল অফিসার, ট্রিম্যান নিউট্রিসিউটিক্যালস লিমিটেড।

221 total views, 1 views today