লিখতে গেলেই বাবার চড় মনে পরে…. পর্ব(২) ………..… লেখক- মানিক ভৌমিক

.…………………………………………
১৯৯৬ সাল। এখন আর আমি ছোট ভীতু ছেলেটি নাই। ভিক্টোরিয়া কলেজ শেষ করে জগন্নাথ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছি। অপরিচিতদের সাথে জমিয়ে কথা বলতে শিখেছি। বন্ধুদের সাথে রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দৃঢ় মতামত দেই । মিছিল- মিটিংয়ে যাই।

সিনিয়র-জুনিয়র মিলে আমরা ১০/১২ জন থাকতাম পুরনো ঢাকার ১৯, জয়চন্দ্র ঘোষ লেনে। ৯৬ এর মার্চ মাস। আন্দোলনে উত্তাল ঢাকাসহ সারাদেশ। হানিফ সাহেব শেখ হাসিনার নির্দেশে তোপখানা রোডে ‘জনতার মঞ্চ’ বানিয়েছেন। প্রতিদিন লাঞ্চ শেষে সবাই একত্রিত হয়ে ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে হেঁটে যেতাম তোপখানা রোডে। শুধু আমরা কেন জনস্রোতে ঢাকার সব রাস্তাই মিলে যেতো জনতার মঞ্চে।

মার্চের শেষ দিকে তারিখটা মনে নেই প্রবীর দাস, ডালিমদা, রিঙ্কুদা, পারভেজ ভাই, রসময়(ভাই), অমলবাবু, শ্যামল (ভাগিনা), পরেশদাসহ ১০/১২জন পদযাত্রা শুরু করেছি। চারদিক থেকে দলে দলে মানুষ আসছে। গুলিস্তান বাস স্ট্যান্ডে আসতেই ডালিমদা অনেকটা খামখেয়ালি করেই হাত উঁচিয়ে বললো “জয় বাংলা”। সাথে সাথেই ২০/২৫ জন গর্জে উঠলো “জয় বঙ্গবন্ধু”। পিছনে তাকিয়ে দেখি শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। দলের নেতৃত্বে আমরা। শ্লোগান বেগবান হতে থাকলো জনতাও লাইনের শেষে জড় হতে লাগলো। জিরো পয়েন্টে পৌঁছাতেই মিছিল বিশাল আকার ধারণ করলো।

জনতার মঞ্চের মাইকে তখন লুৎফর রহমান রিটন স্বরচিত প্যারডি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। তখনকার সময়ে জনপ্রিয় দৈনিক “আজকের কাগজ”-এর সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ রিটনের হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে বজ্রকন্ঠে বলতে লাগলেন, বন্ধুগণ বিশাল এক মিছিল জনতার মঞ্চের দিকে আসছে, আপনারা করতালি দিয়ে স্বাগত জানিয়ে জায়গা করে দিন। শ্লোগান দিয়ে আমরা যতটা সম্ভব মঞ্চের কাছাকাছি চলে গেলাম।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জনপ্রিয় গানগুলো গেয়ে চলছে। চারিদিকে মানুষ বলছে আজ সরকার পদত্যাগ করবে। সচিবালয়ের সকল কর্মকর্তা আজ জনতার মঞ্চে এসে একাত্মতা প্রকাশ করবেন।

অবশেষে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শতসহস্র মানুষের করতালি ও শ্লোগানের মধ্যদিয়ে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে জনতার মঞ্চে উঠলেন সচিবালয়ের কর্মকর্তাগন। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা কর্মীদের আনন্দোচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো তিনি বোধহয় সরকারের পদত্যাগপত্র হাতে করে নিয়ে এসেছেন। নিজের অজান্তেই গালে হাত বুলিয়ে নিলাম। এই লোকটিকে সালাম না দেয়াতেই তো ১৩ বছর পূর্বে বাবা সজোড়ে চড় মেরেছিলেন। আ-হা এতো বড় মাপের লোককে এত কাছে পেয়েও যথাযথ মর্যাদা দেইনি। আমার দু’গালেই চড় মরা উচিত ছিল। বাবা অনেক দূরদর্শী লোক ছিলেন। সামনে বসা লোকটি ভবিষ্যতে অনেক উঁচু চেয়ারে বসবেন বাবা তখনি বুঝেছিলেন।

আমি পাশে থাকা বন্ধুর হাত টেনে বললাম, উনি আমাদের কচুয়ার মানুষ। আমি ছোট বেলা থেকেই তাঁকে চিনি। তাঁর নাম জুনু সাব। চুপ থাক্- বলে বন্ধুটি আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। আমি বুঝে গেছি জুনু সাব এখন শুধু আমাদের কচুয়ার নেই, তিনি হয়ে গেছেন দেশের লক্ষ-কোটি জনতার ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর।

না, সেদিন বিএনপি সরকার পদত্যাগ করেনি। তবে এদিনটিকে কেন্দ্র করে ১৫ ফেব্রুয়ারী ১দলীয় নির্বাচনের ১ মাসের মাথায়ই সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে। (অসমাপ্ত)

মানিক ভৌমিক
সহসভাপতি
কচুয়া প্রেসক্লাব
১১/০২/২০২০

63 total views, 2 views today