চাঁদপুরে সনাতন সমাবেশ-২০২০ আমাদের এক দিকে অস্তিত্বের লড়াই আরেক দিকে জীবন বিকাশের লড়াই এই লড়াইয়ে যুব সমাজকে ঐক্য বদ্ধ ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে …………অ্যাড.রানা দাস গুপ্ত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী হতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই …………..শ্যামল দত্ত

ছবিঃ চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার মেহের কালীবাড়ি প্রাঙ্গনে সনাতন সম্মেলন ২০২০ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. রানা দাস গুপ্ত ও অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সনাতন সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত

সুজন পোদ্দার :
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. রানা দাস গুপ্ত বলেছেন, এদেশে স্বাধীনতার পূর্বে ছিল এক তৃতীংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়কে দেশ থেকে উৎখাত করার জন্যে এবং বাঙালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে সংখ্যালঘু করার জন্য সেদিনের পাকিস্তানের আইয়ূব ও ইয়াহিয়ার সরকার সংখ্যালঘু নিঃস্ব করার প্রক্রিয়ায় শত্রু সম্পত্তি আইন করে আমাদের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। সে সময় আমাদের যে শিক্ষকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলেন যে ডাক্তাররা চিকিৎসালয়ে ছিলেন তাদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ৭০ এর নির্বাচনের পূর্বে আমাদের জনসংখ্যা ছিল ২৯.৭ শতাংশ ৭০ এর নির্বাচনে তা এসে দাড়ালো ৯.৭ শতাংশ। এত নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দল, মত, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিলো এমন একটি বাংলাদেশ যে বাংলাদেশ আর কখনো পাকিস্থানী ধারায় ফিরে যাবে না। যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সাম্য সমতা সামাজিক মর্যাদা তার জন্য নিশ্চিত হবে। তাকে দেশ ছাড়তে হবে না। দেশ স্বাধীনের সাড়ে ৩ বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর শুরু হল আমাদের উপর আবারো নির্যাতন। জিয়াউর রহমানের সময়েও আমরা নির্যাতিত হয়েছি। পরে এরশাদ সরকারের সময়েও ৩দিনের নির্যাতনে অনেকে দেশ ছাড়া হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মন্দির পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরশাদ পতনের পর খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে আমাদের উপর ২৫দিন ব্যাপী নির্যাতন করলেন। আর ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কি হয়েছে তা আপনারা সকলে জানেন। অত্যাচার, নির্যাতন, বাড়ি দখল, স্কুল শিক্ষক থেকে শুরু করে সকলের বাড়ি ঘরে আক্রমন ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ভেবেছিলাম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে আমাদের উপর আর নির্যাতন আর হবেনা। কিন্তু এখনো আমাদের উপর নির্যাতন হচ্ছে। রামু, উখিয়া, টেকনাফ, ব্্র্যাক্ষ্মনবাড়িয়ার নাছিরনগর, পাবনার সাথিয়া একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। এবং তার পর শুরু হল গলা কাটা, মাথা কাটা। মন্দিরে পুরোহিতের মাথা কাটে, খ্রিস্টান যাজকের গলা কাটে, বৌদ্ধ ধর্ম যাজকের গলা কাটে। শুধু তাদের গলা নয় অভিজিৎ রায় থেকে শুরু করে বহু মুক্তচিন্তা মানুষের গলা কাটে। আমরা সরকারের কাছে যখন নির্যাতনের বিষয় গুলো তুলে ধরি তখন ভাবী সরকার বুঝি ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের উপর যত সময়ই নির্যাতন হয়েছে কোন কোন জায়গায় প্রশাসন অথবা আওয়ামী লীগ দলীয় লোকও জড়িত ছিল। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে পুলিশ আসে প্রশাসন আসে আর রাজনৈতিক দলের নেতারা কিছু চাল, কিছু ডাল ও কিছু গম নিয়ে এসে বলে আমরা সম্প্রীতি সমাবেশ করতে এসেছি। কোন কোন জায়গায় নির্যাতনের বিষয়ে মামলা হয়েছে পুলিশ প্রতিবেদনে বলে ঘটনা সত্য কিন্তু কোন সাক্ষী পাওয়া যায় নি। আমরা যখন এলাকা পরিদর্শনে যাই তখন ভুক্তভোগীরা আমাদের অভিযোগ করে আমরা কিভাবে সাক্ষী দিব যারা আমাদের উপর হামলা করেছে তারা সম্প্রীতি সমাবেশের মঞ্চে বসে থাকে। কোন সাহসে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিব।

অ্যাড. রানা দাস গুপ্ত

তিনি আরো বলেন, সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছে তারপরও আজকের যে সংবিধান তা ১৯৭২ সালের সংবিধান নয়, এ সংবিধান বঙ্গবন্ধুর সংবিধান নয়। এ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে ঠিক, কিন্তু জিয়াউর রহমান ও এরশাদের পেতাত্মা থেকে এ সংবিধানকে আজও মুক্ত করা যায় নাই। এ সংবিধানে বঙ্গবন্ধু আছেন আবার পাকিস্তানও আছেন। এক দিকে অস্তিত্বের লড়াই আরেক দিকে জীবন বিকাশের লড়াই এই লড়াইয়ে যুব সমাজকে ঐক্য বদ্ধ ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবেই।কারন আমার আপনার অস্তিত্ব যদি না থাকে, তাহলে কিসের বানিজ্য, কিসের শিক্ষা, কিসের ধর্ম, কোনটাই থাকবে না,যদি মানুষ না থাকে। মানষের অধিকারের জন্য আজকে আমাদের এই লড়াই। লড়াইয়ের উদেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।
তিনি শুক্রবার দুপুরে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার মেহের কালীবাড়ি প্রাঙ্গনে সনাতন চাঁদপুরের আয়োজনে শিক্ষা, বস্ত্র ও সাবলম্বন কর্মসূচির অংশ হিসেবে সনাতন সম্মেলন ২০২০ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপরোক্ত কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সনাতন সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন- সনাতনের কার্যক্রমের সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। শাহরাস্তি কালীবাড়িতে সনাতন সমাবেশে আসার দুটি কারন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত সনাতনের সাথে জড়িত আর দ্বিতীয়টি সমাবেশ স্থলটি মেহের কালীবাড়ি হওয়াতে। এখানে মা সবসময় জাগ্রত বিরাজমান। প্রথমে কালীবাড়ির সাথে সম্পৃক্ত সকলকে প্রণাম জানাই।
বাংলাদেশে এখন ২০১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তারপরও সনাতন একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার চিন্তা করছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদেরকে ভাবতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়টি কি রকম হবে এখানে গতানুগতিক শিক্ষা দেয়া হবে নাকি অন্য কিছু। এর রূপরেখা দাড় করাতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর চেয়ে মা-বাবারা জিপিএ-৫ এর দিকে বেশি যুকে গেছে। বস্তুত এ ধরনের শিক্ষা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আপনারা আইডিয়া তৈরি করেন। তারপর সকলের সাথে আলোচনা করুণ। ঐক্যবদ্ধ ভাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেক কিছু করা যায়। প্রয়োজনে আইডিয়া সভা করতে হবে। সনাতনের ৫৭ হাজার সদস্য রয়েছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ করতে হবে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বি হতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই। গতানুগতিক শিক্ষা গ্রহণ করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে লাভ নেই যদি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ধর্ম ও সমাজকে না জানি। পড়া লেখার পাশাপাশি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকতে হবে। এখনকার বাজারে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে সার্টিফেকেটের বাহিরেও এক্সট্রা অডিনারি কিছু রয়েছে কিনা তা যাচাই করা হয়। অনেক চেষ্টা করেও চাকরি পাওয়া যায় না। আমিও একসময় ঢাকা এসে বেকার ছিলাম। সিংড়া খেয়ে রাত কাটিয়েছি। পরে বহু চেষ্টা করে এ পর্যায়ে এসেছি। আমি বুঝেছি চেষ্টা করলেই পারা যায়। সনাতনের প্রতিটি কর্মীকে লিডারশীপ অর্জন করতে হবে। আমাদের দেশে কোয়ালিটি সম্পন্ন লিডারশীপের অভাব রয়েছে। সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে কোয়ালিটি সম্পন্ন লিডারের বেশি প্রয়োজন। কোয়ালিটি সম্পন্ন নেতা তৈরি করতে হবে। যে নেতা জনগনের পালস বুঝবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষনই তার উদহারণ। সমাজে বঙ্গবন্ধুর মত নেতার অভাব দেখা দিয়েছে। আত্মশুদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন- চোখ খুলে দেখা চেয়ে চোখ বুঝলে বেশি দেখা যায়। চোখ খুলে দেখলে দৃষ্টির সামনে যতটুকু দেখা যায় শুধু সেটুকু দেখা যায়। কিন্তু চোখ বুঝে দেখলে পুরো দুনিয়া দেখা যায়।
শ্যামল দত্ত

সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে বিভিন্ন ফোরামে অনেক কথা বলেছি। যার জন্যে মামলার মধ্যেও পড়েছি। অনেক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। গনমাধ্যমে কাজের সুবাধে অনেক খবর আমার কাছে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের উপর নির্যাতন চালানো হয়। প্রতিবেশী দেশের বিষয়েও আমাদের উপর প্রভাব পড়ে। ৭৫ এর পরে বাংলাদেশী না বাঙালী আর ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তার ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গনতন্ত্রের সংগ্রামে ব্যক্তির ভূমিকা অনেক। কোন কোন সময় এমন মনে হয় যেন আমরা পুঁড়িয়ে গেছি। সামনে আমাদেরকে আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহন করতে হবে। আজ সনাতনে যে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়েছে সে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে।

শাহরাস্তি উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি নিখিল চন্দ্র মজুমদারের সভাপ্রদানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসী এন্ড ডেভেলাপমেন্ট এর সাধারণ সম্পাদক বাপ্পাদিত্য বসু। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সনাতন কর্মী চট্টগ্রাম অঞ্চলের এডভোকেট রাজিব দাস, সনাতন কর্মী ঢাকা অঞ্চলের অসীম দে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, সনাতন সম্মেলনের আহবায়ক ইঞ্জিনিয়ার সোহাগ মজুমদার।

44 total views, 5 views today