‘জয় বাংলা’স্লোগান নিয়ে হাইকোর্টের রায় এবং স্লোগানটির নেপথ্য ইতিহাস!

কচুয়ার ডাকঃ‘জয় বাংলা’-কে জাতীয় স্লোগান করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে রায় বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশও দেয়া হয়েছে।এখন থেকে সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমাবেশের (অ্যাসেম্বলির) পর জয়বাংলা বলতে হবে। মঙ্গলবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ২০১৭ সালে জয় বাংলা-কে কেন জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব ও শিক্ষা সচিবকে রুলের জবাব দিতে হলা হয়।বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ থেকে এ রুল জারি করা হয়। এর আগে আইনজীবী ড. বশির আহমেদ জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিও করেন তিনি। রিটের শুনানি নিয়ে আজ আদালত এ রায় দিলেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলার মুক্তির আন্দোলনের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ একটি রাজনৈতিক স্লোগান যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময জনগণকে তাদের মুক্তিসংগ্রামে প্রবল ভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিল। এর আগে বাঙালি কখনো এত তীব্র, সংহত ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয় নি, যাতে একটি পদেই প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতি, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষার সৌন্দর্য ও জাতীয আবেগ ৬০। জয বাংলা স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রেরণার উৎস। সফল অপারেশন শেষে বা যুদ্ধ জয়ের পর অবধারিত ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে জয বাংলা স্লোগান দিয়ে জয উদযাপন করত। কখন কীভাবে এই স্লোগানটির উৎপত্তি হয়েছিল তা জানা যাক ।

১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯। ঢাবি’র মধুর কেন্টিনে “সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ” এর সভা বসেছে আসন্ন শিক্ষা দিবস (১৭ মার্চ) যৌথভাবে পালনের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য। সভার উপস্থিত সদস্যদের কানে হঠাৎ বেজে উঠল একজন ছাত্র কর্তৃক উচ্চারিত নতুন একটি স্লোগান। ওই ছাত্রটির পেছনে থাকা আরেকজন ছাত্র একাই তার প্রত্যুত্তর করল। ওই দু’জন এবার একসঙ্গে বারবার উচ্চারণ করতে থাকল ওই বিশেষ স্লোগানটি কিছুক্ষণ পর তারা বিরতি দেয়। ওই দু’জন ছাত্রের প্রথম জন হলেন তৎকালীন ঢাবি’র রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমে আর দ্বিতীয় জন হলেন চিশতী হেলালুর রহমান । যে স্লোগানটি তারা দিয়েছিলেন তা হলো ‘জয় বাংলা’। পরে এ স্লোগান ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরাও ধরতে শুরু করে তাদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খানের (কাপালিক) নেতৃত্বে। এই স্লোগানই সময়ের প্রেক্ষাপটে বাঙালির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় প্রথম “জয় বাংলা” উচ্চারণ করেন।

প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য, সর্বদলীয় সভা মিছিলে সর্বদা স্লোগানের প্রতিযোগিতা হত। তো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের বিপরীতে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা বের করে ‘জয় সর্বহারা’ কিন্তু তাদের স্লোগানটি হালে পানি পায়নি।অন্যদিকে ইসলামপছন্দ দলগুলো এই শ্লোগানের মধ্যে হিন্দুয়ানী গন্ধ আবিষ্কার করেছিল । তারা ব্যঙ্গ করে বলতো ‘জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি ছেড়ে ধুতি পিন্দ’ । বস্তুত ১৯৭০ এর নির্বাচনে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রার্থীর মিছিলে এই শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল , কিন্তু কোন কাজে আসেনি ।জয় বাংলা হয়ে উঠেছিল সবেচেয়ে জনপ্রিয় শ্লোগান। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রদত্ত তাঁর বিখ্যাত ভাষণ সমাপ্ত করেন “জয় বাংলা” উচ্চারণ করে।
২৭ মার্চ ১৯৭১ মেজর জিযাউর রহমান পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করে অস্থায়ী কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন তার শেষেও তিনি “জয বাংলা” উচ্চারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওযার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময “জযবাংলা” ব্যবহার করা হতো। এই বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসংগীত ছিল জয বাংলা, বাংলার জয। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল “জয বাংলা, জয স্বাধীন বাংলাদেশ” স্লোগান দিয়ে। (মুক্তিযুদ্ধের অপর নায়কেরা, নুরুজ্জামান মানিক,শুদ্ধ্বস্বর,২০১২)

52 total views, 2 views today