লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের কারাদণ্ড হওয়া বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন

কচুয়ারডাক ঢাকা ডেস্কঃ অর্থ ও মানব পাচারের দায়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের কারাদণ্ড হওয়া বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।

শনিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় প্রথম বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমেটিক টেনিস টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন উনি (পাপুল) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন না, উনি স্বতন্ত্র ছিলেন। এটা খুবই দুঃখজনক, অবশ্যই এটা দুঃখজনক, লজ্জাজনক।

ড. মোমেন আরও বলেন, রায়ের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি কুয়েত সরকার। উনার (এমপি পাপুল) বিচার হয়েছে সেখানে, যেটা আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে শুনেছি। কুয়েত সরকার উনার সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলেনি। প্রথম দিকে জানতে চেয়েছিলাম, তারা তখন রেসপন্ড করেনি। এখন আমরা সরকারিভাবে জানার জন্য আমাদের রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশনা দিয়েছি। বিষয়টি সরকারিভাবে জানলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।মন্ত্রী বলেন, কুয়েত সরকার আমাদের জানালে আমরা সংসদকে জানাব। তখন বিধি মোতাবেক উনার (এমপি পাপুল) সম্পর্কে কী করা হবে, দেখব।

প্রসঙ্গত, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য পাপুলকে গত বছরের ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের সেখানে বসবাসের অনুমতি রয়েছে।পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ এনেছে কুয়েতি প্রসিকিউশন। ১৭ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর এখন তাকে রাখা হয়েছে কুয়েতের কেন্দ্রীয় কারাগারে।

কুয়েতি কর্মকর্তাদের কীভাবে কত টাকা ঘুষ দিয়েছেন, সে বিষয়ে রিমান্ডে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন পাপুল। যা প্রসিকিউটরদের বরাতে প্রকাশ করছে স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। সেখানে নাম আসায় কুয়েতের দুই এমপির বিরুদ্ধেও পাপুলকে বেআইনি কাজে সহযোগিতা এবং অর্থপাচারে জড়িত থাকার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।মামলার তদন্তের সময় অভিযুক্ত হিসেবে ১৩ জনের নাম উঠে আসে। এর মধ্য থেকে চারজনকে তদন্তকালে বাদ দেয়া হয়।

সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার মালিকানাধীন মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানি পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেয়ার কাজ করলেও কুয়েতে অন্যান্য ব্যবসার কাজও বাগিয়েছিলেন পাপুল।এর আগে গালফ নিউজের খবরে বলা হয়েছিল, ‘জেনারেল ট্রেডিং অ্যান্ড কনট্রাক্টিং’ নামক লাইসেন্স ছিল পাপুলের। যার মাধ্যমে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে অ্যানটিক কার্পেটের ব্যবসাও তিনি করতে পারেন। পাপুল ও তার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করেছে কুয়েত কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকটাই অপরিচিত শহিদ ইসলাম পাপুল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাক লাগিয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সমর্থন আদায় করে।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির  সেই চিঠি তুলে ধরা হলো-

আল্লাহ সর্ব শক্তিমান
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি -২০১৮
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ
সভাপতির কার্যালয়
তারিখঃ ২১ ডিসেম্বর ২০১৮
বিষয়ঃ জনাব মোঃ শহীদ ইসলাম (পাপুল সাজাপ্রাপ্ত লক্ষীপুরের এম পি কুয়েত কারাগার) এর সমর্থনে দলীয় সমর্থন প্রসঙ্গে।
প্রিয়
আপনারা সদয় অবগত আছেন যে, লক্ষীপুর-২, সংসদীয় আসন-২৭৫ এর মহাজোট মনোনীত প্রার্থী জনাব মোঃ নোমান মহাজোটের বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামীলীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রাথী জনাব মোঃ শহীদ ইসলামের (পাপুল সাজাপ্রাপ্ত লক্ষীপুরের এম পি কুয়েত কারাগার) সমর্থনে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। আপনাদের জানা আছে যে জনাব মোঃ শহীদ ইসলাম (পাপুল সাজাপ্রাপ্ত লক্ষীপুরের এম পি কুয়েত কারাগার) আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত নেতা ও সক্রীয় মাঠ পর্যায়ের কর্মী।দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত আছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বৃহত্তর স্বার্থে এই আসনের বিজয় দলের পক্ষে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই লক্ষে জনাব মোঃ শহীদ ইসলাম কে (পাপুল সাজাপ্রাপ্ত লক্ষীপুরের এম পি কুয়েত কারাগার) সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে নির্বাচন কমিশনকৃত তার প্রতীকে বিজয়ের পদক্ষেপ গ্রহন অতীব জরুরী।
এই মর্মে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জনাব শহীদ ইসলাম কে (পাপুল সাজাপ্রাপ্ত লক্ষীপুরের এম পি কুয়েত কারাগার) সমর্থন প্রদানের জন্য আপনারা নির্দেশ দিতে পারেন।
এই বিষয়ে আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
শ্রদ্ধান্তে,
প্রতি,
১।জনাব গোলাম ফারুক পিঙ্কূ
সভাপতি
২। জনাব মোঃনুরুদ্দীন নয়ন
সাধারন সম্পাদক
লক্ষীপুর জেলা আওয়ামী লীগ
এইচটি ইমাম কো-চেয়ারম্যানের পক্ষে
স্বাক্ষর ……।।
(ড.সেলিম মাহমুদ)
সমন্বয়কারী
নির্বাচন পরিচালনা কমিটি
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ
তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বললেন, ‘শহিদ ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী আমাদের লক্ষ্মীপুর জেলা, উপজেলা ও কোনো ইউনিয়ন কমিটির সদস্য পদেও নেই। তিনি মাঠপর্যায়ে দলীয় কোনো কাজও কখনো করেননি।’
তাহলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চিঠিতে কীভাবে শহিদ ইসলামকে দলের একজন নিবেদিত নেতা ও সক্রিয় মাঠপর্যায়ের কর্মী বলা হলো—এ প্রশ্নের জবাবে নূর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘হ্যাঁ, ওইভাবে একটা লেখা দেখেছি। ওইটা তো চিঠি যাঁরা ইস্যু করেছেন, তাঁরা বলতে পারবেন। ঊর্ধ্বতন ইউনিট যখন একটা কিছু দেয়, সে বিষয়ে আমাদের তো বলারও কিছু থাকে না।’
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ভোটের সময় লক্ষ্মীপুরে অনেকটা প্রকাশ্য আলোচনা ছিল যে ১২ কোটি টাকার বিনিময়ে নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেন শহিদ। এ প্রক্রিয়ায় জেলা আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা এবং আসনটির সাবেক দলীয় এক সাংসদ যুক্ত ছিলেন। নির্বাচনে প্রার্থী সরানো, ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা থেকে জয়ী হওয়া পর্যন্ত শহিদকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কয়েকজনকে সন্তুষ্ট করতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা ​দিয়ে।
লক্ষ্মীপুর জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম আর মাসুদ বলেন, “বিষয়টা দৃশ্যমান না হলেও এটাই সত্য যে টাকার বিনিময়ে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। পাপুলের সঙ্গে নেগোশিয়েট করেই এটা করেছিলেন। নোমান সাহেব সব খুলে না বললেও পাপুলের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে আমাকে হিন্টস দিয়েছিলেন। ভালো অ্যামাউন্ট পেয়েই ছেড়েছিলেন, এমন ইংগিত আমি পেয়েছিলাম।”
জাতীয় পার্টির নেতাদের বরাত দিয়ে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুর-২ আসন পাপুলকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নির্বাচনের আগে ঢাকায় এইচ টি ইমামের বাসায় একটি বৈঠকও হয়েছিল।
সেই বৈঠকে আসলে কী হয়েছিল, কেন পরে আওয়ামী লীগ কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে চিঠি দিয়ে পাপুলকে সমর্থন দিতে বলেছিল, সে বিষয়ে কথা বলতে এইচ টি ইমামকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে কথা বলতে চাইলেও তিনি সাড়া দেননি।
সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে চিঠিটি ইস্যু হয়েছিল সেটি ছিল নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম সাহেবের সিদ্ধান্তটাই যথাযথভাবে পদাধিকার বলে আমি চিঠিতে জানিয়েছি।
“বাংলদেশে বিভিন্ন সময়ে এভাবে অনেকেই এমপি হয়েছেন। পাপুলের বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। স্বতন্ত্র এমপি পাপুল মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন দায় দায়িত্ব নেই।”
কচুয়ার সেলিম মাহমুদের সুপারিশকৃত সেই মাফিয়া এম পি শহিদুল ইসলাম পাপুল কুয়েত কারাগারে চার বছরের জেল,দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের জন্য কলঙ্ক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।
অর্থ ও মানবপাচারের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুলকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন কুয়েতের একটি আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১৯ লাখ কুয়েতি রিয়াল (৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) এ রায় ঘোষণা করা হয়। গত বছরের ২৬ নভেম্বর এ মামলার শুনানি শেষে কুয়েতের অপরাধ আদালতের বিচারক আব্দুল্লাহ আল-ওসমান এই দিন ধার্য করেন। বর্তমানে পাপুল দেশটির কারাগারে রয়েছেন।
গত ৬ জুন কুয়েতের আদালতের আদেশে মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুল। একই সময়ে পাপুল ও তার পরিবারের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনেদেনের তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
গত ২৭ ডিসেম্বর পাপুলের পরিবারের ৮টি ব্যাংকের ৬১৭টি ব্যাংক হিসাব, ৩০ একরের বেশি জমি, গুলশানের ফ্ল্যাটসহ দেশে থাকা সম্পদ জব্দ করে দুদক। ১১ নভেম্বর অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এমপি পাপুল, তার স্ত্রী এমপি সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিন প্রধানকে আসামি করে মামলা করে দুদক, কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে রইয়ে গেলেন আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ডঃ সেলিম মাহমুদ!
এবার কুয়েতে পাপুলের কত সম্পদ রয়েছে, তার তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কুয়েতে চিঠি পাঠায় দুদক। এতে দেশে পাপুলের বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্তের বিষয়ে উল্লেখ করে কুয়েতে থাকা পাপুলের কোম্পানি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
(প্রথম আলো বিডি নিউজ বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে সংগ্রীহিত)