লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল কদর হলো-এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ!

 মিজানুর রহমানঃ আরবি লাইল মানে রজনি। আর কদর মানে মর্যাদা। সুতরাং লাইলাতুল কদর অর্থ হলো-মর্যাদাপূর্ণ রজনি। যাকে আমরা ফারসিতে শবে কদর বলে থাকি। মুসলমানদের জন্য অতি মর্যাদাপূর্ণ একটি রজনি লাইলাতুল কদর। এই লাইলাতুল কদর তথা শবে কদরের রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর বান্দার উপর রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, এ রাতে অগণিত রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসে, ফলে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে অনন্য এক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করে। বান্দা অন্তর খুলে মাবুদের কাছে তার মনের কাকুতি-মিনতি, ভক্তি-শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিজদার মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে। আল্লাহও বান্দার প্রতি খুশি হয়ে তার রহিম রহমান নামের অছিলায় বান্দার যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

এই রাতটিকে লাইলাতুল কদর হিসেবে নামকরণের কারণ হলো-যেহেতু এ রাতটি অত্যাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমান্বিত। বান্দার পরবর্তী এক বছরের নির্ধারিত ভাগ্যলিপি এ রাতে ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর এ কারণেও এ রাতটিকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
মহিমান্বিত এই রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল কুরআন নাজিলের কারণে এ রাতটিতে যেমন মুসলমানদের জন্য রয়েছে সওয়াব অর্জনের অফুরন্ত সুযোগ তেমনি এ রাতের ফজিলতও অনেক। কুরআনুল কারিমে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি একে নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল কদর হলো-এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। প্রত্যেক কাজের জন্য এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাইল) অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে। আর এই নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সূরা আল কদর, ৯৮ : ১-৫)

তাফসিরে মাজহারিতে হজরত ইবনে আবি হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা মহানবি (সা.) সাহাবিদের সামনে বনি ইসরাইল জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। যারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করার কারণে অধিককাল ব্যাপী আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা কোনো নাফরমানি করেনি। মহানবি (সা.) এর জবান থেকে এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত বিস্মিত হলেন আর নিজেদের ব্যাপারে আফসোস করতে লাগলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে কেরামের এই আফসোসের প্রেক্ষিতে এই সূরাটি নাজিল করেন। এ রাতের মর্যাদা যে অনেক সেকথা বোঝানোর জন্য যেমন অসংখ্য হাদিসে এর ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালা এ রাতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে সূরা আল কদর নামে পূর্ণ একটি সূরা নাজিল করেন।
এ রাতের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনেই বলা হয়েছে,‘নিশ্চয়ই আমি কুরআনকে লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি। আপনি কি জানেন এই লাইলাতুল কদর কি? লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। যে রাতে ফেরেশতাগণ ও জিবরাঈল (আ.) তাদের মালিকের সব ধরণের আদেশ নিয়ে অবতরণ করে, এটা শান্তিময় রজনি যা ফজরের আবির্ভাব হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সূরা আল কদর, ৯৮ : ১-৫)

বুখারি শরিফের একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, মহানবি (সা.) বলেন, ‘যদি কেউ ইমানের সাথে সওয়াবের আশায় বিশুদ্ধ নিয়তে লাইলাতুল কদর কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজে অতিবাহিত করে তার পূর্ববর্তী সকল অপরাধ ক্ষমা করা হবে।’

মিশকাত শরিফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে মহানবি (সা.) বলেন, ‘যদি তোমরা কবরকে আলোকিত পেতে চাও তাহলে তোমরা লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত করো।’ লাইলাতুল কদরে স্বয়ং হযরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের বিশাল একটি দল নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। এ সময় যত নর-নারী নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকেন তাদের সবার জন্য আল্লাহর কাছে রহমতের দোয়া করেন।’

ইবনে মাজাহ শরিফে বর্ণিত একটি হাদিসে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমুদয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো।’ আবু দাউদ শরিফের অন্য একটি হাদিসে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শবে কদর পেলো অথচ ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে তা কাটাতে পারলো না, ঐ ব্যক্তির মতো হতভাগা দুনিয়ায় আর কেউ নেই।’
তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ-তে উল্লেখ আছে, একবার হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) রসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমি কখনো শবে কদর পাই, তাহলে আল্লাহর নিকট কোন দোয়াটি আমি করবো? তিনি বলেন, তুমি এই দোয়াটি করবে। ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ ( হে আল্লাহ, আপনি অসীম ক্ষমাশীল, ক্ষমা আপনার পছন্দ। অতএব, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।)

লাইলাতুল কদরের ফজিলত অনেক। তাই সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, সালাতুসতাসবিহ, কুরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা, জিকির-আজকার, তসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইস্তেগফার, দুয়া-দুরূদসহ ইত্যাদি সব ধরণের নফল ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

বুখারি, মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে শবে কদরের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। তবে অনেকেই মনে করেন ২৬ রমজানের দিবাগত রাতই শবে কদর। তাদের এ ধারণাটি আসলে সঠিক নয়। ২৭ রমজানের রাত লাইলাতুল কদর হওয়ার ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) এর সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। তবে যে কথাটি বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে তা হলো-২১ রমজান থেকে ২৯ রমজন পর্যন্ত বেজোড় রাতগুলোর যে-কোনো রাতই লাইলাতুল কদরের রাত হতে পারে। লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, আবার আমাকে তা ভুলিয়েও দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহে তা খোঁজ করবে।’ (বুখারি)

তাফসিরে মাযহারিতে বলা হয়েছে, আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয়ে নয়টি হরফ রয়েছে। আবার সুরা আল কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয় তিনবার এসেছে। সুতরাং নয়কে তিন দিয়ে গুণ করলে সাতাশ হয়। এ কারণে সাতাশে রমজানের রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদরকে নির্দিষ্ট না-করার কারণ হলো যাতে বান্দা যেন কেবল একটি রাত জাগ্রত থেকে ও কিয়াম করে ক্ষান্ত না-হয়। আর সেই রাতের ফজিলতের উপর নির্ভর করতে গিয়ে অন্য রাতের ইবাদত ত্যাগ করে না-বসে।’ তাই স্বয়ং নবি করিম (সা.) লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জন করার জন্য রমজানের শেষ দশরাত জাগ্রত থেকে ইবাদতে কাটিয়েছেন। তাঁর উম্মতকেও সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার কথা বলেছেন। তাই সওয়ার প্রত্যাশী সকলেরই উচিত শেষ দশকের কোনো রাতকে বাদ না দিয়ে পুরো রাত ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়া। বিশেষ করে বিজোড় রাতগুলো।